Monday, May 10, 2021

ভয় আর ভালোবাসা -- PART 02

 PART: 02


ফিরছে। বাস ফ্লাইওভারে উঠলে ভালো লাগে। গাড়ি দেখা যায়না তেমন। বাতাসটা মনে হয় একটু পাতলা আর ঠান্ডা। নিঃশ্বাস নিতে ভাল লাগে। জানালায় কনুই দিয়ে ভর দিয়ে মাথাটা হাতের উপর রাখলো। আনিকার সাথে সময় ভালো কাটে। কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ম্যাডামের কথা মাথা থেকে দূর হয়। ভাবছে সামনে থেকেও তাই করবে। রাতে বাসায় ফিরে মনযোগ দিয়ে এসাইনমেন্ট করলো। ভালোই লাগলো পড়তে বসে। অনেকদিন মনোযোগ দিয়ে পড়ে না। মজা পেল এসাইনমেন্ট করতে গিয়ে। ঔষধ যেমন জীবন বাঁচায় তেমনি কিছু ঔষধ অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহনে মৃত্যুও নিয়ে আসে। নিজের জীবনের সাথে মিল খুঁজে পেল কবির। ঔষধের মত অতিরিক্ত মায়াও ভালো নয়। সব শেষ করে দেয়।

পরদিন কবির পড়াতে গেলো। দরজা খুললো কাজের মেয়ে। সবসময়ের মত ম্যাডাম না। কতক্ষন পর নাস্তা এলো কাজের মেয়ের হাতে। সবসময়ের মত ম্যাডাম না। কবির কিছু বলল না। আরো কতক্ষন পড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো। দরজা লাগালো কাজের মেয়ে।
এভাবে এক সপ্তাহ গেল। ম্যাডামের দেখা নাই। উনি কবিরের সামনে আসেন না। এই এক সপ্তাহ কবির হাজারবার ভেবেছে ম্যাডামকে ভাইবারে নক দিবে। বার বার উনাকে দেখতে ইচ্ছে হয়েছে। আয়ানকে ম্যাডামের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু করেনি। ভেবেছে ম্যাডাম দূরে থাকলেই ভালো দুইজনের জন্যই। উনি স্বামীর দিকে মনযোগ দিক। আর কবির পড়াশোনায়। এতে দুই পক্ষই ভালো থাকবে। আগামী মাসের শুরুর দিকে কবিরের সেমিস্টার ফাইনাল। এরপর সেমিস্টার ব্রেক। ওইদিনের সিঁড়ির ঘটনাটার পর ঠিক করেছে কবির আর এই টিউশনিটা করবেনা। আর ম্যাডামের সাথে দেখা হবেনা ভাবতেই কলিজাটা প্রচণ্ড ব্যাথা করলো! এক সপ্তাহ দেখা না হতেই এত কষ্ট, তাহলে সামনে কিভাবে থাকবে! না পারতেই হবে কবিরকে। নিজেকে বোঝালো। মোবাইলটা নিয়ে শফিক সাহেবকে কল দিল। ম্যাডামের কাছে শুনেছে শফিক সাহেব নাকি খুব রাগী। মেজাজ হারালে কি করেন আর বলে ঠিক থাকেনা। আবার মন ভালো থাকলে খুব ভালো ব্যাবহার সবার সাথে। কবিরের সাথে যে অল্প কবার কথা হয়েছে প্রতিবারই খুব হাসিখুশি আর প্রাণচঞ্চল ছিলেন। কিন্তু আজ কেমন জানি খুব গুরুগম্ভীর শোনালো। মনে হয়ে অসুস্থ দেখে। তাও কবিরের কাছে ঠিক লাগলো না। মন কেন জানি বলছে অন্যকোন কাহিনী আছে। কবির জানালো সে আগামী মাস থেকে আর পড়াবেনা আয়ান আর অবনীকে। এইটা শুনে শফিক সাহেব কল রিসিভ করে যেরকম গম্ভীর গলায় “হ্যালো” বলেছিলেন তার চেয়ে আরো গম্ভীর গলায় “ওকে” বলে কল কেটে দিলেন। কেন বা কি কারনে ছেড়ে দিচ্ছে সেটা পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করলেন না। ব্যাপারটা কেন জানি ঠিক লাগলোনা কবিরের।


পরদিন ছোট্মার সাথে ফোনে কথা বলছে। কবে বাড়িতে আসবে জানতে চাইলেন। আরো বললেন লাবণী কতটা উতলা হয়েছে ভাইকে দেখার জন্য। জানালো আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সেমিস্টার ফাইনাল। ছোটমা কে কথা দিলো এবার ফাইনাল শেষ হলে ওইদিনই রাতের বাসে বাড়ি চলে আসবে। গতবারের মত টিউশনীর কারনে ঢাকা রয়ে যাবে না। ভালো লাগলো এইভেবে যে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ তাকে দেখতে চায়। আর এইদিকে শামীমা ম্যাডাম এক সপ্তাহে একবার সামনে আসেনি। দেখা করেনি, কথা বলেনি। এসব ভাবছে আর ছোটমার কথা শুনছে। এর মধ্যেই শামীমা ম্যাডামের কল। কি আজব টেলিপ্যাথি! একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল এসছে বলে মাকে কল কেটে দিতে বলে তাড়াতাড়ি ম্যাডামের কল ধরলো। যাক এতদিনে আমার কথা মনে পড়ল উনার। খুশি হয়েই ফোন ধরে হ্যালো বললো। ওপাশ থেকেও তাই আশা করেছিল। কিন্তু উনি কবিবের হ্যালো শেষ হবার আগেই বললেন,
“তোমার কি মাথা পুরো গেছে?”। কবির থতমত খেয়ে কোনরকমে বলল, “জ্বি বুঝলাম না”।
ম্যাডাম বললেন, “তুমি বাসায় আসো। তোমার সাথে দরকারী কথা আছে”।
কবির বুঝলো কি ব্যাপারে কথা বলতে চাইছে। এখন সেটা নিয়ে ফোনে কথা বলা যাবে না কারন উনার মাথা গরম। যদিও এখন বিকেল তবু ঠিক করল বাসায়ই যাবে কারন আজকে এমনিতেই পড়াতে যাবার কথা। বলল, “আমি এখন আসছি”।

ম্যাডামের বাসায় যেতেই উনি দরজা খুললে কবির দেখলো ম্যাডামের কপালের ডানপাশে ব্যান্ডেজ লাগালো। বাম গালের নিচে লালছে কালো দাগ। কবির কিছু বলার আগেই ইশারায় বললেন গেস্ট রুমের সাথে লাগোয়া ব্যালকনিতে যেতে। কবির ইতস্তত বোধ করলেও চলে গেল। ম্যাডামের পেছন পেছন আসলো। কবির ঢুকতেই দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বললেন,
“তুমি শফিককে কি বলেছ?”, “তুমি না মেয়ে নিয়ে মজা করে বেড়াচ্ছো কিন্তু আমি সমাধান তো করছিলামই। তুমি কেন ওকে কল দিয়ে উলটা পালটা কথা বললে?”
কবির কোন প্রশ্নর উত্তর দিবে বুঝে উঠলোনা।
বলল, “আমি টিউশনি ছেড়ে দিচ্ছি সেটাই উনাকে বললাম”।
ম্যাডাম ওর কথা শেষ হবার আগেই বললেন, “আমাদের ব্যাপারে শফিককে কি বলেছ? ও জানলো কিভাবে ওই ব্যাপারটা?”
কবির ম্যাডামের মুখে আঘাতের দাগ আর ব্যান্ডেজের কারন কিছুটা আঁচ করতে পারলো।
বলল, “আমি শুধু মাত্র টিউশনি না করার কথাই বলেছি। অন্য কিছু না”।
কবির আরো বলল, “আমি এমন কিছু কেন বলব যাতে আপনার সমস্যা হয়। আমি আমার চরম ক্ষতি করে হলেও আপনাকে রক্ষা করবো কারন আপনি আমার খুব কাছের। ভালোবাসার মানুষের জন্য আমি খুনও করতে পারি”। এসব বলতে গিয়ে গলা ধরে এল কবিরের।
ম্যাডাম অপলক চেয়ে আছেন কবিরের দিকে। রাগ চলে গিয়ে ম্যাডামের ওই সবুজ চোখে পানি জমা শুরু করেছে। কবির বুঝতে পারলো আজকে প্রথম নিজের ভালোবাসার কথাটা জাহির করে ফেলেছে। চোখ সরিয়ে নিল ম্যাডামের দিক থেকে। চায়না ম্যাডাম কবিরের চোখের পানি দেখুক।
ম্যাডাম এগিয়ে এসে কবিরকে জড়িয়ে ধরলেন। কবিরও তাই করলো। এতদিনের চেপে রাখা অনূভুতি আর গত এক সপ্তাহ না দেখার কষ্ট। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রন করতে পারলো না। সব মিলিয়ে  নিজের অজান্তেই চুম্বনের অংক মিলিয়ে ফেলল। ওইদিনের অন্ধকার সিঁড়ির মত কবির হতবিহ্বল হয়ে রইলো না। চুম্বনের ঘোরে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো।



কতক্ষন সময় এমন ছিলো জানে না কবির। আস্তে করে দুইজন অপরজন থেকে সড়ে দাড়ালো। কবির বুঝতে পারছেনা কি বলবে।
ম্যাডামই আগে কথা বললেন, “শফিক সিঁড়ির ওই ব্যাপারটা জেনে গেছে। কাজের মেয়ে গুলো মনে হয় দেখে ফেলেছিল। শফিক সম্ভবত ওদের কাছ থেকে শুনেছে”।
যদিও সেদিন আধো আলো ছায়ায় কবিরের মনে হয়েছে আয়ানের অবয়ব দেখেছে। ম্যাডামকে এই কথাটা বলল না।
কবিরের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে ম্যাডাম বললেন, “ যেদিন শফিকের হার্টের অসুখের ল্যাব রিপোর্ট আসলো সেদিন প্রচণ্ড অপরাধবোধ হচ্ছিল। রাতে তাহাজ্জুদের নামাযে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেটে দোয়া করছিলাম শফিকের জন্য। মাফ চাইছিলাম আল্লাহর কাছে আমার অপরাধের জন্য। হয়তো একটু জোরে জোরের বলছিলাম। শফিক শুনে ফেলে। আমি রুমে আসতেই বলে কি অপরাধের জন্য তুমি ক্ষমা চাইছো আর কান্না করছো? আমি কথা ঘুরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু শফিকের সন্দেহ হয়”।
কবির চুপ করে শুনে যাচ্ছে। কিছুই বলছেনা। সামনে কি ঝামেলা আসছে ভেবে চিন্তা হচ্ছে।
ম্যাডাম বলে চললেন, “পরদিন সকাল থেকে শফিক বাসায়। আমিই যেতে দিই নি। বিকালে সুপারশপে গেলাম বাজার করতে। ঘন্টা দুয়েক পর বাসায় এসে দেখি কাজের মেয়ে একটা কাঁদছে। আয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কিছু বলল না। অবনী বলল বাবা বকা দিয়েছে ওকে”।
রুধশ্বাসে কবির বলল, “তারপর?”
ম্যাডাম মুখের ব্যান্ডেজ দেখিয়ে বললেন, “তারপর হল এই। শফিকের বদ মেজাজের স্বভাব আছে কিন্তু ও এর আগে কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি। সম্ভবত কাজের মেয়েটাকে তোমার আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলো। নিশ্চয়ই শফিকের রাগের সামনে পড়ে সব বলে দিয়েছে। আমারও ওই মেয়েকে কিছু জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছে হয়নি। শফিক রাগে দুঃখে আমার গলা চেঁপে ধরে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। ধাক্কা দেয়াতে ওয়ালে মাথা লেগে ব্যাথায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম”।
এইটুকু বলে ম্যাডাম কবিরের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বললেন, “কি ভাবছো?”
কবির বলল, “আমার জন্য তোমার, ইয়ে মানে আপনার এত বড় সমস্যা হয়ে গেল”।
কবিরের হাতটা ধরে ম্যাডাম বললেন, “তোমার দোষ নেই কবির। আমিই ভালোবাসার পাগল। আমি ভালবাসার মানুষের জন্যই বাঁচি। তাদের ভালোলাগা-মন্দ লাগা, তাদের ঘিরেই আমার জীবন। এক কথায় শফিক আর বাচ্চারা আমার পৃথিবী। কিন্তু শফিককে আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। ওর দিন রাত কাজ আর কাজ। ছুটে চলা এক শহর থেকে আরেক শহর। ফোন করে বাচ্চাদের খোঁজ নেয় কিন্তু আমি কেমন আছি জিগ্যেসও করেনা । বাইরে থেকে এসে দেখে বাচ্চারা ঘুম। আর সকালে বাচ্চারা ওকে ঘুমে রেখে স্কুলে চলে যায়। আর সেক্স লাইফ? সেটারো সময় নেই। রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় আসে। আমার উপরে উঠে নিজের ইচ্ছে মত যা করার করে। তারপর ধপাস করে নিজের বালিশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। একবার জিগ্যেসও করেনা আমার কেমন দিন গেল। আয়ান তো বড় হচ্ছে। এখন মার সাথে তেমন কথাই বলে না। আজকাল তো একদমই না। আর অবনী ওর পড়ালেখা নিয়ে নিজের মত থাকে। যাদের নিয়ে আমি আমার পৃথিবী বানিয়েছি তারাই আমাকে বাদ দিয়ে ওদের আলাদা আলাদা পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে। এই সবের মাঝে তুমি এসেছিলে আমার এই খালি পৃথিবীতে। প্রথমদিন তুমি কেমন আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলে। এমনভাবে যেন খুব সুন্দর কিছু দেখছো। ওইদিনের কথা বার বার মনে পড়ে। ওভাবে আমার দিকে অনেকদিন কেউ তাকায়নি। ঘরের আর আট দশটা ফার্নিচার হয়ে গিয়েছিলাম সবার চোখে। তোমাকে দেখে আমি অনুপ্রেরনা আর শক্তিই দুটোই পেতাম কারন তুমি কত সহজে নিজের প্রিয় বোন, পরিবার আর বাড়ি থেকে এসেছ এই শহরে মনের শান্তির জন্য। আর আমি আমার প্রিয় মানুষের ছেড়ে কোথাও চলেও যেতে পারিনা তোমার মত।
ম্যাডামের কথা গুলো কবিরকে ছুঁয়ে গেল। কখন যে চোখের পানি গড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে টের পায়নি। এই মানুষটাকে ছেড়ে কবির কিভাবে দূরে যাবে?
দুইজন দুইজনের হাত ধরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। রুম থেকে কিসের যেন আওয়াজে সৎবিত ফিরে পেল। তাকিয়ে দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। ঝট করে হাত ছেড়ে দিল কবির।

সেদিন টিউশনিটা কোন রকম শেষ করল। আয়ান আগের মত কথা বলে না। চুপচাপ থাকে। আর অবনী তো পড়া যা দেয় তাই পড়ে। একবার বুঝালে বুঝেও যায়। আরেকবার বলা লাগেনা। মেয়েটার মাথায় কি চলে কে জানে। কেন এমন অদ্ভুত এই মেয়ে ভাবে কবির। বিশেষ করে ম্যাডামের সাথে কথা বলার পর থেকে ভাবছে কিভাবে আজকাল কার বাচ্চারা মা থেকেও আলাদা হয়ে যায়। কত দ্রুত! আর কবির এখনো নিজের হারানো মায়ের কথা ভেবে কাঁদে।

বাসায় গিয়ে কোনরকমে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। কাল কত সুন্দর পড়া লেখা করল। আর আজ ম্যাডামের বাসায় নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে দিয়ে এসে অদ্ভুত লাগছে। একদিকে হালকা লাগছে বলে দিয়ে। আরেকদিকে আতঙ্কিতবোদ করছে কারন শফিক সাহেব জেনে গিয়ে ম্যাডামের গায়ে হাত তুলেছেন। জানেনা আজ কি হচ্ছে। তবে কবির এইটা জানে সব ভালোবাসার পরিনতি হয়না। একজনের প্রতি আরেকজনের ভালোবাসাটাই শুধু মিল। আর কিছুই মিলে না। এটা কেউ মেনে নিবেনা। না পরিবার না সমাজ। এটা ভাবতেই পড়াশোনার সব ইচ্ছে মিটে গেলো। কবিরের একবার মনে হয় বাড়ি চলে যাই। আরেকবার ভাবে ম্যাডাম কি করছে কি জানে।

রাতে বুয়ার রান্না করা মাছ দিয়ে ভাত কটা জোর করে গিলল। জঘন্য স্বাদ। আর বাড়িতে বাজারের টাটকা ছোট্মাছ দিয়ে নিমিষেই দুই প্লেট ভাত খেয়ে ফেলতে পারতো কবির। শুয়ে মাত্র তন্দ্রা মত এসছে। তখনই ভাইবারের ম্যাসেজ নটিফিকেশনে সেটা ভেঙ্গে গেল। ম্যাডাম নাকি আনিকা? আনিকা। এসাইনমেন্টটা কাল স্পাইরাল বান্ডিং করতে যাবে একসাথে। সেটা জানানোর জন্য মেসেজ। কবির বিরক্ত হয়ে রেখে দিল। একটু পর আবার নটিফিকেশনের আওয়াজ এলো। আবার ওই মেয়ে নিশ্চই কোন অকাজের কথাই লিখেছে। কিন্তু কেন জানি শান্তি পাচ্ছেনা। আবার মোবাইল খুলে দেখে ম্যাডামের মেসেজ! লেখাটা এমন,
“শফিক আমাকে বাঁচতে দিবেনা। আজ যা করলো। এতোটা বাজে ব্যাবহার করবে আমি ভাবতে পারিনি। জানো আমি কোনদিন বাবা-মায়ের মার খাইনি।ঠিকই করেছে। আসলে আমি এটারই যোগ্য। তুমি টিউশনি ছেড়ে দিয়ে ঠিক করেছ। আমি ওকে বুঝিয়েছি যা ছিলো সব আমার পক্ষ থেকে। তোমার কোন দোষ নেই। আমি চাই না আমার কারনে তোমার কোন ক্ষতি হোক। অনেক দূরে থেকে হলেও আমার ভালোবাসাটা যত্ন করে রেখো। আর এই সব মেসেজ ডিলিট করে দিও। আমিও ডিলিট করে দিয়েছি।“

মেসেজটা পড়ে কবিরের কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। রাগে মুখ আর কান গরম হয়ে গেলো। নাহ এভাবে আর চলবে না। ওর জন্য ম্যাডাম এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ম্যাডামের মত একটা সুন্দর মানুষের গায়ে হাত তুললো ওই লোক! একটা শিক্ষা দিতেই হবে। ভাবতে ভাবতে মাথায় বুদ্ধি এলো। তাড়াতাড়ি উঠে লাইট জালালো রুমের। রুমমেটে গালি দিয়ে উঠলেও সেটার পরওয়া করলোনা। ম্যাডাম কদিন আগেই বলল ওই বেটার হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। নিশ্চয়ই হার্টের ঔষধ খাচ্ছে। এখন হার্টের ঔষধের সাথে যদি “নন-স্টেরোইডাল এন্টি-ইনফ্লেমেটরি ঔষধ” যেমন “ডিক্লোফেনাক” বা “নাপ্রোক্সেন” বেশি মাত্রায় খাইয়ে দেয়া হয় তবে কদিনের মধ্যে হার্ট-এটাক করে মরবে। মানুষ ভাববে হার্টের ব্লকের জন্যই মারা গেছে। এগুলো সব কদিন আগের করা এসাইনমেন্ট করতে গিয়ে শিখেছে। কিন্তু কিভাবে দিবে। আর ঔষধ গুলা কোথায় পাবে? ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল হাবিব স্যারের কথা। উনি বলছিলেন কিভাবে শাহবাগের ঔষধের দোকান গুলোতে প্রেস্ক্রিপশন ছাড়াই যেকোন দেশি বিদেশী ঔষধ পাওয়া যায়। কিন্তু আরো কিছু ব্যাপার রয়েছে। ওই ঔষধ শফিক সাহেব কে কিভাবে খাওয়াবে। উনি নিশ্চই রেগুলার ঔষধের বাইরে কোন ঔষধ দেখলে সন্দেহ করে বসবেন। আরো ভাবতে ভাবতে একটা হলিউডের ছবির কথা মনে পড়ে গেল যেখানে এক লোক তার বউকে ডাক্তারের ব্যাবস্থাপত্রে দেয়া সাধারন ক্যাপ্সুলের মাঝে অন্য ঔষধের উপরকণ ঢুকিয়ে দিয়ে মেরে ফেলেছিল। মানে ডাক্তারের দেয়া ভালো ঔষধের ক্যাপ্সুলের খোলসে খারাপ ঔষধ ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। ওই মহিলার হার্টের অসুখ ছিলো বলে কেউ সন্দেহ করেনি। খুব খুশি হল কবির। “শফিক এবার বুঝবি কাউকে মারার মজা” বিড়বিড় করে বলল। সন্তুষ্ট হয়ে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। কাল শাহবাগ যাবে ওই ঔষধগুলো কিনতে। আনিকাকে মেসেজ দিয়ে রাখলো যে সে কাল স্পাইরাল বাইন্ডিং করতে যাবেনা।


সকালে তাড়াতাড়ি উঠে রেডী হল। ভাইবার গিয়ে দেখে আনিকার শুধুমাত্র একটা এংগ্রি ইমোজি দিয়ে ওর আগের রাতের মেসেজের জবাব দিয়েছে। রাগুক। এখন কবিরের এসব ভাবার সময় নেই। ওই বেটাকে শিক্ষা দেয়া না পর্যন্ত কবিরের শান্তি নেই। শাহবাগের অলি-গলি খুঁজে ওই সব স্পেশাল ঔষধগুলো বের করছে। মাঝে ছোট্মা ভিডিও কল দিয়েছিল। লাবনী নাকি দেখতে চেয়েছে ভাইকে। কবির কল কেটে দিয়েছে। এই ঝামেলাটুকু যাক। তারপর আসবে কবির। প্রাণ ভরে দেখবে তখন। রাতে রুমমেট ঘুমিয়ে গেলে ঔষধগুলো ট্রলী ব্যাগে লুকিয়ে রাখলো যেন রুমমেট দেখে সন্দেহ না করে।

পরদিন ক্লাসে পুরাটা সময় আনমনা ছিল। আগেরদিন আনিকার সাথে বাইরে যায়নি বলে মেয়েটা আজকেও রেগে আছে। আজ ক্লাসে ঢুকেই সব সময়ের মত আনিকার পাশে না বসে কোনার সিটে গিয়ে বসে পড়ল। আনিকা দেখে অবাক হয়েছে। কবিরের সেদিকে মনযোগ নেই। কিভাবে ওই শফিক বেটাকে ঔষধগুলো খাওয়াবে সেটাই ভাবছে। ক্লাস শেষে লাইব্রেরীতে গিয়েও তাই ভাবলো। হার্টের ব্লকের জন্য কি ঔষধ দেয় সেটা বের করার চেষ্টা করলো। কিন্তু বাংলাদেশে ঔষধ বিক্রি হয় ব্রান্ডের নামে। তাই একই উপাদানের অনেক কোম্পানি ঔষধ বানায়। এখন শফিক সাহেব কে ডাক্তার কোনটা দিয়েছে সেটা তো কবির জানে না। নাহ! এভাবে হবে না। হতাশ হয়ে লাইব্রেরীতে বসে রইলো। আনিকা দূর থেকে কবিরকে দেখছে। কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে সেটা বুঝতে পারলো।

সন্ধ্যায় পড়াতে গেল। ম্যাডামের দেখা নাই। একবার ভাবলো আয়ানকে জিগ্যেস করবে। কিন্তু ওইদিন ব্যালকনিতে ম্যাডামের হাত ধরা অবস্থায় আয়ান ওকে দেখে ফেলেছে। আবার ওইদিন অন্ধকার সিঁড়িতে ম্যাডাম হুট করে কবিরকে কিস করে ফেলার দিনও আয়ানকে আবছা আলোয় দেখেছে বলে কবিরের মনে হয়। যদিও পুরোপুরি নিশ্চিত না। তাই আর ওদের জিগ্যেস না করার সিদ্ধান্ত নিলো। যাওয়ার সময় ওদের কাজের মেয়ে একটা কে জিগ্যেস করলে বলল ডাক্তারের কাছে গেসে। রাগ লাগছে কবিরের। জানা গেলোনা ওই বেটা কি ঔষুধ খাচ্ছে। অবশ্য ম্যাডাম থাকলেও কবির হয়তো জানতে পারতো না শফিক সাহেব কি ঔষুধ খাচ্ছেন। কিন্তু ওই বেটাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য যে কবির ঔষধ দিচ্ছে সেটা উনাকেও বলতে পারবে না। আর বললেও ম্যাডাম এটা কখনোই করবে না। কবির জানে ম্যাডাম নিজের চেয়ে কাছের মানুষদের বেশি ভালোবাসেন।


বাসায় ফিরছে হেঁটে হেঁটে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে। ভেবে কোন হাল পাচ্ছেনা কিভাবে ওই শফিক বেটাকে ঔষধ গুলো খাওয়াবে যেন ঐ লোক আর ম্যাডাম কেউই না জানতেই পারে।  খুব হতাশ লাগছে। মাঝে কদিন সেই ভূতুরে অদ্ভুত শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরেনি। আজ ভাবলো যাবে। আজকেও সেই একই ঘটনা। কুকুরগুলো ল্যাম্পপোস্টের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। কবিরের সেদিকে মনযোগ নেই।


মনকে যতই বুঝাক তাও বার বার ম্যাডামের কথাই ভাবা শুরু হয়ে যাচ্ছে আনমনে। কেমন আছে,কি করছে তাই ভাবে। নিশ্চই স্বামীর মারের আঘাতের কারনেই ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন। মনে মনে জঘন্য গালি দিল ওই বেটাকে আর ভাবলো মেরে আবার ডাক্তার দেখানো হচ্ছে! ভাইবারে মেসেজ দিলো ম্যাডামের মানা শর্তেও। একটু পর পর এপ এ ঢুকে দেখছে ম্যাডাম মেসেজ দেখেছে কিনা সেটাই দেখতে। না। কবিরের ম্যাসেজের কোন উত্তর আসেনা। পড়াশোনা লাটে উঠেছে। খুব ছোট্ট কারনে বুয়ার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। লাইট জ্বালিয়ে রাখা নিয়ে রুমমেটের সাথে ঝগড়া করে বলেই বসলো সে বাসা ছেড়ে দিবে। আনিকার সাথেও আর যোগাযোগ করেনি। ছোট্মার কলও ধরেনি। ভাবছে এই একটা ব্যাপার নিয়ে ভেবে ভেবে একে একে সবার মন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একটা ঘোরের মাঝে রাতটা পার করলো। দিনে আরো কয়েকটা মেসেজ দিয়েছিলো। ঔষধের ব্যাপারে কবিরের প্ল্যান নিয়ে ম্যাডামকে জানিয়ে মেসেজ লিখে সেন্ট না করেই আবার ডিলিট করে দিলো। হতাশার আরেকটা দিন গেলো।

এরপরদিন কবির টিউশনিতে যাচ্ছে হেঁটে হেঁটে। যেতে যেতে ভাবছে  শফিক সাহেবকে শিক্ষা দেয়ার প্ল্যান বাদ। কবির নিজেই অনেক দূরে চলে যাবে। যেখানে ম্যাডামের কোন ইচ্ছে নেই কবিরের সাথে থাকার তাহলে কবিরের এসব করার দরকার নাই। আর এইটা যদি কোনভাবে ম্যাডাম জেনে যান তবে কবির উনার কাছে ঘৃনার পাত্রই হবে। থাক। কবিরের কারনেই সব সমস্যা। এইতো আর এই সপ্তাহটা বাকী।
পড়াতে পড়াতে আধা ঘন্টার মত হয়েছে। এমন সময় ম্যাডাম রুমে আসলেন। কবির ভেবেছিলো ম্যাডাম আর সামনেই আসবেনা। দেখলো উনার ঠোঁটের দিকে কাটা দাগ আর পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ পেঁচানো। কবির সেটা দেখে ভয়ংকর রাগ উঠে গেলো। ও কিছু বলার আগেই বললেন,
“আয়ান-অবনী, আজ তোমাদের স্যারের পড়ানোর শেষ দিন। ওর ফাইনাল পরীক্ষা তো সেজন্য।”

 ওরা কিছুই বলল না। তাকিয়ে রইলো। অবনী শুধু মাথা নাড়ালো এমনভাবে, যেমন করে মাথা নাড়ে যখন কবির কোন পড়া বুঝিয়ে দেয়ার পর জিজ্ঞ্যেস করে বুঝতে পেরেছে কিনা।

কবির বুঝে উঠতে পারেনা কি বলবে। তাও বলে উঠলো “ম্যাডাম…”।
কবির কথা শেষ করার আগেই বললেন, “ কবির আজকে ওদের তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দাও। আর যাবার আগে একটু কথা বলে যেও।”

 কবির মনে মনে ভাবলো আজ সব কথাই বলে যাবে। আজ তো কথা বলতেই হবে। মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে। তাও আয়ান আর অবনীকে ওদের পড়া ঘুছিয়ে দিল। আয়ানকে দেখে বুঝা যাচ্ছে ছেলেটা কবিরের উপর রেগে আছে। এটা অবশ্য ওইদিনের অন্ধকারের সিঁড়ির ঘটনার পরেরদিন থেকেই কবির সেটা বুঝতে পেরেছে। আর আয়ানও বোকা নয়। যা হচ্ছে ঘরে তা বুঝার ক্ষমতা ওর আছে। বুঝতে পারছে কোননা কোন ভাবে কবির দায়ী।
পড়ানো শেষ করে চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়েছে তখনি ম্যাডাম রুমে এসে বললেন, “তোমরা তোমাদের রুমে যাও। মা তোমাদের স্যারের সাথে কথা বলি”।
ওরা চলে যেতেই ম্যাডাম কবিরের হাতে টাকা ভর্তি খাম ধরিয়ে দিয়ে হড়বড় করে বললেন,
“এই তোমার বেতন। আর কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। এখানে তোমার বেতনের চেয়েও অনেক বেশি টাকা আছে। এই এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও বাসা নাও। আমি চাইনা তুমি আমার পরিবারের কাছে আসো“।

পায়ের নিচে মাটি সরে যাওয়া কিংবা মাথায় আকশ ভেঙ্গে পড়া। এই কথা গুলো কবির বইয়ে অনেক পড়েছে কিন্তু আজ সত্যি সত্যি অনূভব করলো। প্রচন্ড রাগ আর অভিমান চেঁপে বসলো। কি বলবে বুজতে না পেরে জোরে হেঁসে উঠলো! ম্যাডাম অবাক হয়ে একবার কবিরের দিকে তাকায় আরেকবার দরজার দিকে। ভাবছে কেউ কবিরের হাসি শুনতে পেয়েছে কিনা।
হাসি থামিয়ে কবির বলল, “তো ভালোবাসা শেষ?” বলেই আবার হাঁসা শুরু করলো কবির।
আবার হাঁসি থামিয়ে বলল, “আপনার জন্য কত সহজ তাই না? একদিন এত ভালোবাসা যে অন্ধকারে চুমু খেয়ে বসেন আর আরেকদিন কিছু নাই?”।

শামীমা ম্যাডাম দরজার দিকে আরেকবার তাকিয়ে বলেন, “তুমি মনে কর আমার জন্য এটা সহজ? তুমি শফিককে চেনো না। এইযে দেখছো আমার গায়ে আঘাতের দাগ এগুলো এত বছরের সংসারে প্রথমবার ঘটেছে আমার সাথে”।
কবিরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বললেন, “তুমি কোন প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে না। তোমাকে ক্ষতি করা শফিকের জন্য কোন ব্যাপার না”।

কবির বলল, “তো এখন আমাকে আপনার প্রভাবশালী স্বামীর ভয় দেখাচ্ছেন?”
ম্যাডাম বললেন, “না আমি এতদিন ওর থেকে তোমাকে বাঁচিয়ে এসছি। এখনো তাই করার চেষ্টা করছি। আমি সবকিছুর দায়ভার আমার কাঁধেই নিয়েছি। ওকে হাতে পায়ে ধরে বুঝিয়েছি যেন তোমাকে কোন ক্ষতি না করে। তুমি দূরে চলে গিয়ে ভালো থাকো।“

কবির বলল,”দূরেই যদি চলে যেতে বলার ছিল তবে শুরু থেকে এত এত মায়া আর ভালোবাসা দিয়ে কাছে টানার কি দরকার ছিলো?”
কবির খাম থেকে ওর যতটুকু বেতন সেটা নিয়ে বাকি টাকা ম্যাডামের হাতে দিয়ে বলল, “পৃথিবীতে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি আনন্দ আর ভালোবাসা পা্বার হকদার হয় তবে সেটা আপনি।“

রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং এ আসলো। টেবিলে খাবার দিয়ে সাজানো নাস্তার ট্রে। বোধহয় কবিরকে দেবার জন্যই রেডি করেছিল। প্রথমদিনের কথা মনে পড়ে গেলো। ট্রে থেকে পানির গ্লাস নিয়ে পানি খেতে গিয়ে দেখলো ঔষধের বক্সে রাখা নতুন ঔষধের কৌটা। নামটা দেখলো। তাচ্ছিল্য করে বলল, “আপনার প্রানপ্রিয় স্বামীর?”
যদিও এটা শামীমা ম্যাডামের ঔষধ। বলতে গিয়েও বললেন না। চাইছেন না কথা বাড়াতে। কবিরের এইসব অদ্ভুত ব্যাবহারে শুধু অবাক হচ্ছেন। কবির চলে যাক চিরতরে। নাহলে শফিক খুনই করে ফেলবে এই ছেলে কে।
চলে যাবার আগে ম্যাডামের মাথার ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “শফিক সাহেব যা করেছেন ঠিক করেননি। আপনার গায়ে হাত তুলে চরম ভুল করেছেন"


No comments:

Post a Comment

ভয় আর ভালোবাসা -- PART 03

  PART : 03  কবির চলে যাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না শামীমা ম্যাডাম। ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওই টাকাটা দিয়েছিলো কবিরের ভালো...