Wednesday, September 30, 2020

ছোট গল্প ০১ ---আজ শনিবার

 জ শনিবার, ঘুম থেকে উঠেই আবিদের এটা মনে হল।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই হন্তদন্ত হয়ে অফিস যাওয়ার অভ্যাস এখনো যায়নি। তাই চোখ মেলেই মনে হয় দেরি হয়ে যায়নি তো! সকাল বেলাটা লিয়াকত স্যার এর ত্যাড়া মার্কা কথা দিয়ে শুরু করাটা কখনো চায়নি সে। এখন আর অবশ্য শুনতে হবেও না। গুনে গুনে চার শনিবার আগেই যে দুইটা 'না' বলে দিয়েছে তার একটি হল লিয়াকত স্যার কে। অবশ্য সেদিনও লিয়াকত স্যার এর গলা এতোটুকু নরম হয়নি। স্যার এর কথায় এতটুকু আন্তরিকতা ছিলো না। একবারের জন্যও এমন কোন কথা বলেননি যা দিয়ে বুঝায় আবিদ তাদের অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় কেউ। যেন সে না আসলেই বাঁচে! আসলে ওদেরই লাভ আবিদ না আসলে। করনা কালে প্রথম দুই মাস এর বেতন এক মাস হিসেবে পেয়েছে। এরপর অফিস থেকে বেতন দেয়াই বন্ধ করে দিল। "সেলস নাই তো বেতন কেমনে দিব..বউ এর গয়না বিক্রি করে?", " কোন রকম চলেন আগামী বছর থেকে সব ঠিক মত পাবেন" এই হল লিয়াকত স্যারের কথা। চারটা মাস মেসে খেয়ে না খেয়ে ধার দেনা করে চলেছে। বাসা থেকে টাকা নেয়া যাবেনা। বড় ভাই সংসার চালায়। থাকে শহরের অন্য এক প্রান্তে। মা-বাবার কাছে টাকা থাকেনা। উনারাও থাকেন বড় ভাইয়ের সাথে। আবিদ মাঝে মাঝে  বিকাল করে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে। মা বলে রাতে খেয়ে যেতে। কিন্তু আরো একটা মানুষকে খাওয়ানোর জন্য ভাবীর বিরক্ত চেহারা দেখতে চায়না সে। আর বেশিক্ষন থাকলে মায়ায় পড়ে যাবে। মায়ার বাঁধন কঠিন বাঁধন। আটকে গেলে পরে কষ্ট পেতে হয়। যেমন এখন পাচ্ছে 'মৌ' কে না বলে। এইটা হল একমাস আগে বলা দ্বিতীয় না। তিন বছরের সম্পর্কের ইতি টানা হয়ে গেল। 

শুরুটা যদিও হয়েছিল মৌ-এর ইচ্ছায়। মাস্টার্স এ থাকতে বন্ধুত্ব, নোট শেয়ার, লাইব্রেরিতে পড়া বুঝানো, একসাথে একটু আধটু শপিং এ যাওয়া ফাইনাল সেমেস্টারে এসে প্রেমে বদলে গেল। আবিদ রাতদিন মৌ এর প্রিপারেশন আর পরীক্ষার টেনশন করে পার করল। ফলাফল আবিদের রেসাল্ট আশানুরূপ হলনা। এই নিয়ে বন্ধুদের হাসাহাসি আজ অব্দি শুনতে হয়। যতটা আগ্রহ আর ভালোবাসা নিয়ে মৌ এসেছিল ঠিক যেন ততটাই দ্রুত ওর ভালোবাসা ফুরিয়ে যেতে লাগলো! একসময় নিজেই মৌ এর মেসেজ সিন না করে ফেলে রাখতো। নিজের কাজ কিংবা পড়া টুকু শেষ করার জন্য। কারন জীবনে অনেক টাকা না হলেও স্বাচ্ছন্দ্যেময় ও সম্মানজনক একটা চাকরি চেয়েছিল। পরে তার উল্টোটা হওয়া শুরু করল। বাইরে ঘুরে বেড়ানোটাও কমে গেল কারন একটা প্রাইভেট ব্যাংকে ওর চাকরি হয়ে গেল। প্রাইভেট ব্যাংকের ডিমান্ডিং ওয়ার্ক আওয়ার এর উসিলায় আবিদের কলগুলো মিসড কলের লিস্টে চলে যেতে লাগলো। মেসেজগুলোর রিপ্লাই আসলো 'I'm busy' অথবা 'I'll call you later' টাইপ যা মোবাইল থেকে অটোমেটিক সেট করা। অফিস শেষে ক্লান্তর অযুহাতে দেখা করা হয়না। শুক্রবার ঘরের একশ কাজের আর মেহমানের অযুহাত। এমন হল ব্যাপারটা যেন মৌ যত দ্রুত সরে যেতে শুরু করলো আবিদ যেন ততটাই বেশি ভালোবাসায় পাগল হয়ে যেতে শুরু করলো! এটা জেদ ও হতে পারে। একারনে ওর মনে সন্দেহ ভর শুরু করল। মৌ এর অফিসে সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থাকা, ওর ফেসবুকে কার কার ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দিয়েছে, কি কি কমেন্ট করেছে সব দেখা শুরু করলো। এই নিয়ে ঝগড়াঝাটি, ব্লক করা একজন আরেকজনকে। এভাবে অনেকবার হল। আবিদ খেয়াল করল যখনি ঝগড়া শেষে কথা বন্ধ হয়। একদিন পরেই ওর মন আকুপাকু করে আবার কথা বলার। মৌ এর কোন আগ্রহ নাই। আবিদই শুধু প্যাচ আপ করার জন্য লেগে থাকে মৌ এর পেছনে। যেন সব ঠেকা আবিদের! কখন যেন সম্পর্কে শুধু আবিদই রয়ে গেল! একদিন বেসরকারি এক প্রতিষ্টানে আবিদের চাকরি হল। যদিও ওর পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মিল নাই। আবার বেতন ও কম। তাও রাজি হয়ে গেল এই ভেবে যে মৌ এর সাথে ঝগড়া আর ওকে হারিয়ে ফেলার চিন্তা থেকে কিছু সময়ের জন্য হলেও দূরে থাকবে। কিন্তু  হল উল্টো।


 চাকরি হবার সুসংবাদ টা সারপ্রাইজ হিসেবে দিতে চেয়েছিল আবিদ। যেই ভাবা সেই কাজ। সন্ধ্যায় ওর অফিসের সামনে ফুল হাতে দাড়িয়েছিল। যদিও এসব ফুল দেয়া নেয়া আবিদের পছন্দের ব্যাপার না। তার উপর মানুষ বার বার তাকায় বলে অস্বস্তি বোধ করে। তাও সেদিন সব ঝেড়ে ফেলে ফুল নিয়ে দাড়িয়ে ছিল। আজ স্পেশাল ডে বলে কথা! ফোন করে জেনে নিয়েছে ১৫ মিনিট পর বের হবে। ১৫ মিনিটের আগেই বের হল মৌ উজ্জ্বল হাসি মাখা মুখ নিয়ে কিন্তু সাথে ওই বড় ভাই যার সুপারিশে এই চাকরিটা হয়েছে। ওর সুন্দর হাসি মাখা মুখ আর সাথে সুদর্শন ভদ্রলোক। কি অদ্ভুত কষ্ট হল আবিদের। কতদিন দেখেনা মৌ এর এমন হাসি। সব সময় কপট রাগ আর বিরক্তি থাকে মৌ এর মুখে যখনি ওর সাথে বাইরে যায় কিংবা দেখা হয়। হাজারটা চিন্তা মাথায় আসলো। ওই লোক কি সব সময় আসে মৌ এর অফিসে। যদিও বড় ভাইয়ের মত বলে কিন্তু আসলেই কি সেরকমই সম্পর্ক? আর কত কত? তবে সবচেয়ে বেশি মনে গেঁথে গেল মৌ এর এমন প্রান খুলে হাসি। যে হাসি দেখে একসময় সব কষ্ট আর হতাশা ভুলে যেত আজ সেই হাসিই তার ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। না সেদিন দেখা করার মানসিক শক্তি জুটাতে পারেনি। চোখ ফেটে কান্না আসতে লাগলো। চোখের পানি ওই ফুলগুলোর উপর পড়ল আর পড়ে এমনভাবে রইল যেন দোকানী মাত্র পানি ছিটিয়ে দিয়েছে তাজা রাখার জন্য। পেট খারাপের অযুহাত দিয়ে কোন রকম পালিয়ে এসেছে মেসে। এক ঘন্টা শাওয়ার ছেড়ে ভিজল, কান্না জলে ভিজে একাকার হল। চোখ লাল হল। মাথাও ধরল। আজ শেষ করে দিবে সব সম্পর্ক। এই ভেবে কল দিল মৌ কে। কল ধরেই মৌ এর হাসি হাসি গলা। অনেক খুশি সে। কারন ওই বড় ভাই নাম মাহফুজ যার সুপারিশে মৌয়ের চাকরি হয়েছে উনি ওদের ব্রাঞ্চে সেকেন্ড ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করছেন। পাঁচ মিনিট মৌ উনার গুনগান আর উনি কত মজার সে কথা অনর্গল বলে গেল। আবিদও শুনে গেল। অনেকদিন পর মৌয়ের আনন্দময় গলা শুনতে পেয়ে ভালো লাগছিল। না আবিদ সেদিনও কিছু বলতে পারলো না। বলল শুধু চাকরি খবর। শুনে মৌ কি খুশি হল নাকি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এই ভেবে যে ওকে দিনে রাতে আগের মত বিরক্ত করবে না,  কে জানে। চাকরিতে ঢুকে কথা আর যোগাযোগ আরো কমে গেল। দিনে লিয়াকত স্যারের কটাক্ষ করে কথার খোঁচা আর রাতে গিয়ে দেখে মৌ এর অফিস পার্টি কিংবা কলিগের সাথে বাইরে খেতে যাবার ছবি। কোনটা তে কষ্ট বেশি আবিদ বুঝে উঠেনা। সব একই লাগে মেসের বুয়ার হাতের রান্নার মত। এভাবেই চলতে থাকলো কয়েক মাস।


এরপর এলো করনা। লকডাউন। অফিস বন্ধ। মৌ এর ফোন বিজি আর ওয়েটিং এর পালা এল। আগে কেটে দিত ব্যাস্ত থাকলে। আর এখন থাকে ওয়েটিং। ওয়েটিং কেন থাকে জিজ্ঞাসা করলে বিরক্ত হয় মৌ। মাহফুজের ছবিতে এখন মৌ লাভ রিয়েক্ট দেয়। মাহফুজ ও তাই। মাহফুজের মায়ের সাথে মৌ ভিডিও কল দিয়ে কথা বলে আর মাহফুজ সেটা স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। আহা! ওদের দেখে আবিদের কেন জানি নিজের মায়ের কথাই বার বার মনে পড়ে। মায়ের মত কেউ তো ভালবাসেনা ওকে। করনার কারনে মাকে দেখেনা অনেকদিন। ভাই-ভাবীর নিষেধ এই করনা কালে যেন আবিদ না আসে বাসায়। যদিও মা-বাবা কত বয়স্ক আর ওদের প্রানের ঝুঁকির দোহাই দিয়েছেন ভাবী। আসলে ওরা ভয় পাচ্ছে নিজের আর ওদের ছোট মেয়েটার জন্য। আবিদ বুঝে সব। কিছুই বলেনা। সবাই সবার মত ভালো থাকুক। একদিন ওর সবকিছু হবে। তার ভাগের পাওনা সে বুঝে পাবে। এই সব সান্তনা দিয়ে মনকে আর কতটুকুই বুঝানো যায়? এইদিকে অফিস থেকে বেতন দেয়া বন্ধ। ওইদিকে মৌ আরো শত মাইল দূরে চলে গেছে। আর পাশের রুমের তৌহিদ এসে দেশের যে কি খারাপ অবস্থা হতে চলেছে তার বর্ননা। 

একদিন ধৈর্যের বাধ ভাঙলো। পর পর দুইটা কল করলো। প্রথমে লিয়াকত স্যার কে। পরেরটা মৌ কে। দুইজনকেই বলল সে আর পারছে না। বুঝতে পারলো ওরা দুইজনই খুশি হয়েছে। খুশি থাকুক। করনার এই সময়ে খুশি থাকাটা জরুরি।


বন্ধু তৌহিদ। একটু স্বাস্থ্যবান। গালে সুন্দর দাড়ি। শিশুতোষ একটা চেহারা। একটু পর পর লুংগিটা খুলে ঠিক করে পরবে। লুংগি পড়ার সময় গায়ের সেন্টো গেঞ্জিটা দাতে কামড়ে ধরে রাখে। ফলাফল ওর লোম ভর্তি পেট দেখা। মায়া মায়া ভাব আছে ওর মধ্যে। ওর যদিও একটা দিক খারাপ লাগে সেটা হল হা-হুতাশ করা সব সময়। ফেসবুক খুঁজে খুঁজে সব নেগেটিভ নিউজ সে দেখবে এবং শেয়ার দিবে। আর এসে আবিদকে সব বলবে। তবে রান্না করে ভাল। ফার্মের মুরগীও এত ভালো রান্না করে যে কোন গন্ধ লাগেনা। খেতে অমৃত লাগে। আরেকবার ভাত নেয়া যায়। ওকে সব কষ্ট শেয়ার করতে ইচ্ছা হয় আবিদের কিন্তু করেনা। বেচারা নিজেই সৎ বাবার অনাদর আর কঠিন শাসনে বড় হওয়া একটা ছেলে। একটা ফার্মাসিটেক্যাল কোম্পানিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্ন্টেটিভ হিসেবে ছিল। করনা তে চাকরি চলে গেছে। এই নিয়ে মাঝে মাঝে ওর হতাশা চেঁপে বসে। আর হতাশ হলেই ওর প্রিয় গল্প করে। কেন ছাত্রীর সায় থাকার পরও একা বাসা পেয়েও ছাত্রীর সাথে শারিরীক সম্পর্কে জড়ায়নি। আজ যদি তাই করত তবে বড়লোক এক শশুর পেত আর টাকার কোন চিন্তাই করতে হতনা! আর বলে "ভাইরে দুনিয়াতে ভাল মানুষির দাম নাই"। 

আরেকটা ভালো দিক হল তৌহিদ কখনই এক ঘন্টার বেশি হতাশায় থাকেনা। আবার ঠিক হয়ে যায়। মনে হয় একটু করে কেঁদে আসে টয়লেট থেকে। আবিদ ভাবে ওর ও তাই করা উচিত। কান্না করা। চোখের পানিও এখন সহজে আসে না।

ও এসেই বলবে এটার ব্যাবসা করা উচিত ওইটার ব্যাবসা করা উচিত। ছয় মাস করে টাকা হলে ওই ব্যাবসা থেকে অন্য কোন ব্যাবসাতে চলে যাবা।

আজকাল আবিদকে প্রায় সময় বুঝায় রাস্তার পাশে টেবিল নিয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস জিনিস বিক্রি করার ব্যাবসা করতে। বিশেষ করে এই সময়ে সব কিছু অনলাইনে হচ্ছে। বাচ্চাদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে অফিসের মিটিং আর স্বাস্থ্যসেবা। এজন্য অনেক ইলেকট্রনিকস জিনিসের প্রয়োজনীয়তা এসছে। আবিদ লোকলজ্জার কথা ভেবে করে না। কেউ যদি দেখে ফেলে কি যে লজ্জা লাগবে ভাবতেই আবিদ পিছিয়ে যায়। এদিকে অনেক টাকা ধার দেনা হয়ে গেছে। আসলে তৌহিদ নিজেও একা একা শুরু করতে লজ্জা পাচ্ছে। সাথে কাউকে চাইছে।

ভাবীর রক্তচোখ, চাকরি ছেড়ে দেয়ার কারনে বড় ভাইয়ের বকা, মা-বাবার হা-হুতাশ সব সহ্য করে ভাইয়ের কাছে টাকা চাইলো। বেতন না পেয়েও এতদিন চলেছে আবিদ। এরপর আরো একমাস গেল। সব শুনে ভাইয়ের মন একটু হলেও গললো। ভাই টাকা দিলেন। যদিও ভাবী এইটা শুনিয়ে দিলেন উনার জন্য মামাতো ভাই বিদেশ থেকে নাকি পাঠিয়েছে এই টাকা। দ্রুত ফেরত দেয়ার জন্য বলা আরকি। এইটুকু আবিদ বুঝে।

সবকিছু বন্ধু তৌহিদ করল। দরকারী মালপত্র কিনলো। কদিন আবিদকে নিয়ে রাস্তার পাশের হকারদের সাথে কেনাকাটা করার বাহানায় কথা বলে নিল। কোথায় কোন সময় বসলে ভালো বেচাকেনা হবে সেটা ঠিক করলো। তৌহিদের উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ভালো লাগছে আবিদের। নতুন কিছু নিয়ে ব্যাস্ত দুই বন্ধুর আলোচনা। আবিদ খেয়াল করল এসব নিয়ে ব্যাস্ত থেকে ওর মৌ এর কথা মনে পড়েনি দুই দিন! এই ভাবনা নতুন ব্যাবসার প্রতি ভালোলাগা আর আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিল। তৌহিদের শিশুতোষ উৎসাহ আস্তে আস্তে আবিদের মধ্যেও ছড়িয়ে গেল।

আজ প্রথম দিন। তৌহিদ সব শিখিয়ে দিয়েছে। রিকশা থেকে বস্তা ভর্তি মালপত্র নামালো ফোল্ডিং টেবিল সমেত। ভাড়া নিয়ে রিকশাওয়ালা চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। রিকশাওয়ালা যেন বুঝতে না পারে আবিদ একজন হকার। কোনভাবেই মুখের মাস্ক সরে যেতে দিচ্ছেনা আবিদ। সবচেয়ে পুরান টি-শার্ট টা পড়ে এসেছে যা অনেক দিন পড়ে নাই। চায়না প্রথম দিনই কেউ ওকে দেখে ফেলুক! আর যদি মৌ দেখে ফেলে তবে তো মাথা কাটা যাবে একদম। মৌ এর চিন্তাটা আসা একদম উচিত হয়নি। এইভেবে নিজের উপরই বিরক্ত হল আবিদ। ইচ্ছে করে মোড়ের থেকে দূরে টেবিল সাজালো। প্রথম দিন বলে স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করার জন্য একটু সময় দিতে চায়। কাস্টমারকে ডাকাডাকি করতে চায় না। তাই একটা কাগজে "২ পিস ১০টাকা" লিখে নিয়ে এসেছে। সেটা মাস্কের বড় প্যাকেটের উপর রাখলো।  সবকিছুর প্রাইস্ট্যাগ রেডি করে এনেছে। প্রতিটা জিনিসের প্রাইসট্যাগ প্রতিটা জিনিসের সাথেই সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলো যেন বেশি কথা বলতে না হয়। আসলে আবিদের ভয় পরিচিত কেউ না দেখে ফেলে!

ঠিক করেছে আজ বেশিক্ষণ থাকবে না। কিন্তু প্রথম দিন হিসেবে ভালোই বিক্রি করল। অদ্ভুত আনন্দ হল। এজন্য মাঝে একবার তৌহিদকে কল দিয়ে খোঁজ নিল ওর কেমন চলছে জানতে। যতক্ষন থাকবে ভেবেছিল তার চেয়ে বেশিই থাকলো যেহেতু বিক্রি ভালোই হচ্ছে আর তৌহিদও মানা করলো এত তাড়াতাড়ি যেতে। এই কিছুদিনে তৌহিদের সাথে বন্ধুত্বটা আরো গভীর হয়েছে। ওর কথা ফেলতে পারলো না।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হচ্ছে। চারিদিকে সোনালী আভা। আজকে আকাশটা সুন্দর লাগছে। অন্যদিন থেকে একটু বেশি ভালো লাগছে। আহা! আবিদ আনমনা হয়ে আকাশটা দেখতে লাগলো। 

হঠাৎ পাশের খিচুড়ি বিক্রি করা ভ্যানওয়ালার ছেলে বলল "মামা পুলিশ আইতাসে, সবরে তুলি দিতেসে...তারাতারি ভাগেন!"

আবিদ তাড়াহুড়ো করে সব বস্তা ভরতে শুরু করলো। তাড়াহুড়ায় মাস্কের "২ পিস ১০টাকা" লেখা কাগজটা পড়ে গেল। আবার লেখা যাবে ভেবে আবিদ কাগজটা তোলার প্রয়োজন মনে করলোনা।

আবিদ মাথা নিচু করে সব গোছাচ্ছে। এই সময় এক লোক এসে মাস্কের দাম জিজ্ঞাসা করলো। ও বসে মাথা নিচু করে জিনিস গোছানোর মধ্যে থেকেই মাস্কের দাম বলল। লোকটা শুনতে পায়নি। আবার বলল "দুইটা কত দিব?”। এমনিতেই মাস্ক সরে গেছে অনেকটা তার উপর ও পুরাটা সরিয়ে বলল "১০টাকা ভাই"। লোকটা কে পরিচিত মনে হচ্ছে। পর মুহূর্তে চিনে ফেলল। মাহফুজ!

যদিও মাহফুজ এর সাথে কখন পরিচয় হয়নি আবিদের। তাও ওকে কোথাও দেখে থাকবে যেহেতু মৌ এর সাথে ফেসবুকে অনেক ছবি ছিল। কিন্তু আবিদের মনে হল মৌ ও থাকতে পারে মাহফুজের সাথে। তাই আনমনেই মাস্ক উঠিয়ে ঠিক করে ডানে তাকিয়ে বামে তাকাতেই দেখে মৌ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মৌ-এর দৃষ্টি স্পষ্টতই বলে দিচ্ছে চিনতে পেরেছে আবিদকে। হঠাৎ সবকিছু যেন শুন্য মনে হতে লাগলো আবিদের। একটু আগের যানবাহন আর মানুষের আওয়াজে ভরপুর এই ব্যাস্ত মোড় কেমন যেন নিঃশব্দ লাগলো। সংবিৎ ফিরল মাহফুজের " এই নিন ১০টাকা" বলায়। মাহফুজ একটা মাস্ক মৌকে দিয়ে আরেকটা নিজে পড়ে সিএনজি ঠিক করতে লাগলো। মৌ, মাহফুজকে দামদর করতে না দিয়েই উঠে বসল সিএনজি তে। আবিদ উল্টোদিকে ফিরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সব শুনতে পেল। ওভাবেই রইল যতক্ষন না ওই সিএনজিটা চলে গেল।

গোছানো শেষ। আজকে ভালোই বেচাকেনা হল। কাল আরো ভালো হবে সেই আশা মনে। অগোছালো করে রাখা টাকা পকেট ফুলিয়ে রেখেছে।  একটা রিকশা ঠিক করে বাসার পথে রওনা দিল। মাস্কটা খুলে ফেলল। যে না দেখার সেই যখন দেখে ফেলেছে তবে এই মাস্কের আর প্রয়োজন নাই। যে ভয় পেয়েছিল আজ প্রথম দিনই তা হয়ে গেল! একটু আগের দৃশ্য বার বার সিনেমার ফ্লাশব্যাক এর মত ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। মনে মনে বলছে "বিকাল পাঁচটায় মৌ এখানে কেন?" "ওর তো অফিসে থাকার কথা"। মনে পড়ল ব্যাংক শনিবার বন্ধ। রিকশাওয়ালা বলল " মামা কি কন বুঝিনা আফনের কতা!"

আবিদ আনমনে বলল " আজ শনিবার"। 

Sunday, September 27, 2020

স্মৃতিচারন ০১ঃ সময়ের সাথে সাথে শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা কি চলে যাচ্ছে?

 এমনিতেই একটা ব্যাক্তিগত কারনে কয়েকদিন ধরেই প্রিয় স্যার এর কথা মনে পড়ছিল। বিশেষ করে একটা ভিডিও দেখলাম অনলাইন ক্লাসে এক ছাত্র শিক্ষককে নোংরা ভাষায় গালি দিল দেখে খুব খারাপ হল মনটা। অনেক স্মৃতি আর ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেলো। আমি চাঁপা স্বভাবের। এজন্য কাউকে মনের কথা বলা হয়ে উঠে না। তারউপর গুছিয়ে সুন্দর ভাবে কথা বলতে জানিনা বলে কেউ কথা শুনার আগ্রহও দেখায় না। আমার মত মানুষের জন্য একমাত্র মাধ্যম হল লেখা। তাই ভাবছিলাম কিছু লিখি প্রিয় স্যার কে নিয়ে।

বলছি আমার প্রিয় কবির স্যার এর কথা। মানুষটা মৃত কিন্তু আমার প্রতি উনার ভালোবাসা, মায়া আর কাজের ক্ষেত্রে উনার সততার আদর্শের শিক্ষা আমার কাছে উনাকে চিরজীবী করে রেখেছে। প্রচন্ড রাগের একটা মুখোশের আড়ালে একজন খুব মায়াময় মানুষ। বেশির ভাগ মানুষ উনার রাগী রুপ দেখেছে এবং সেভাবেই মনে রেখেছে। উনার মায়া করার রুপ খুব কম মানুষ জানে। ভালো একজন শিক্ষকের পাশাপাশি খুব ভালো একজন মানুষ। জানিনা কোন কারনে এবং কেন এত এত স্নেহ আর মায়া করতেন আমাকে। মনে আছে স্যার এর বাসায় পড়তে যেতাম বিকাল 3 টায়। স্যার আরেকজন লোকসহ রুম শেয়ার করে থাকতেন। একই কলোনি তে থাকার কারনে আমি ১৫-২০ মিনিট আগেই চলে যেতাম। স্যার আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে উনার বাসায় দরজা বাইরে থেকেই খুলে ফেলা যায়! বলতেন "কাউকে বলবি না কিন্তু আবার!" দুপুরে আমি গিয়ে দেখতাম স্যার ঘুমাচ্ছেন। স্যার এর খাট এর পাশে চুপচাপ বসে থাকতাম ৩টা বাজার জন্য। মাঝে মাঝে জেগে যেতেন। চোখ মেলে একবার তাকিয়ে দেখে বলতেন "আব্বা আসছস তুই?"। হ্যা..উনি আমাকে 'আব্বা' ডাকতেন। কিন্তু অন্যদের সামনে ডাকতেন না! কখন থেকে এবং কেন ডাকতেন আমার মনে নাই। আমি 'জ্বি আসছি স্যার' বললে উনি আমার পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন ”আরেকটু ঘুমাই..সবাই আসলে ডাকি দিস"। কোনদিন আমি আসলে উঠে যেতেন আর উনার বাড়ির কথা বলতেন। কোনদিন যদি ইলিশ মাছ রান্না হয় আর যদি খেতে কম ঝাল আর মজা হয় তাহলে সেদিন কি যে খুশি! বলতেন
"চারটা ভাত খা..আজকে বুয়া ইলিশ মাছ অসাধারন রান্না করসে!"
আমি বলতাম, " স্যার আমি এইমাত্র ভাত খাই বের হইসি।"
স্যার বলতেন, "আরে খা..পারবি, আমি কাঁটা বেছে দিব"। স্যার কাঁটা বেছে বেছে একটা কাগজের উপর সুন্দর করে রাখছেন..এখনো চোখের সামনে ভাসছে। যেদিন ইলিশ মাছ রান্না হবে সেদিন দুপুরে স্যার এর বাসায় গিয়ে আবার ভাত খাওয়া একটা নিয়ম হয়ে গিয়েসিল।
কি শুনে মনে হচ্ছে না অনেক বয়স্ক একজন মানুষ? না, উনি এখন আমার যা বয়স সেরকমই!
যেদিন স্যার এর আকদ হল রাংগুনিয়াতে তার কয়েকদিন পর স্যার এর বাসায় পড়তে গেলে বললেন,
”একটা কথা আছে, কাউকে বলবিনা কিন্তু...আমি বিয়ে করসি!"
ক্লাস এইটের হলেও আমি এতটুকু বুঝি যে বিয়ে স্বাভাবিক একটা জিনিস। আমি অবাক হয়ে বললাম "স্যার সবাই জানলে কি হবে!?"
ছোট বাচ্চার মত লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, "আর কাউকে এখনো বলি নাই যে সেজন্য!" পরে বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে বাসায় এসেছিলেন দাওয়াত এর কার্ড দিতে।
আরেকবার স্যার এর বাসা থেকে পড়ে ফেরার সময় উনার বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে আমের চাঁমড়াতে পা পিছলে পড়ে খুব ব্যাথা পেয়েছিলাম। মাথায় ব্যাথা পেয়েছি বলে সবাই ধরে স্যার এর রুমে নিয়ে আসলো। স্যার আর উনার রুমমেট আমার মাথায় পানি দিলেন। উনার গামছা দিয়ে পরম যত্নে মাথা মুছে দিলেন। উনার গামছার গন্ধ এখনো অনুভব করার চেষ্টা করি আর উনার সেই চিন্তিত ও মায়াভরা মুখ নিয়ে 'তুই ঠিক আছোস? বার বার কানে বাজে। উনার মত এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করেনা আমি ঠিক আছি কিনা। এজন্যই কষ্টের দিনগুলোতে উনাকে অনেক বেশি মিস করি।
পরীক্ষার সময় আমি আর সবার মত ব্যাস্ত লিখা নিয়ে। স্যার কখন জানি ক্লাসরুমে এসে আমার একদম পাশে এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বসে পড়তেন। মাঝে মাঝে ওভাবেই চুপচাপ বসে থাকতেন আর দেখতেন আমি কি লিখি। আবার মাঝে মাঝে কানের কাছে ফিসফিস করে বলতেন,
"আব্বা প্রশ্ন কেমন হইসে...পারবি তো?”
"পড়ালেখা করেছিস তো..নাকি ফাকিবাজি করসস?"
"খারাপ রেজাল্ট করলে আমার কাছে পড়তে আসবিনা কিন্তু!"
কোনরকমে বলতাম "জ্বি স্যার"
আমি খুব অস্বস্তিবোধ করতাম স্যার আমার সাথে বসে আছে বলে। যেখানে পরীক্ষায় স্যার সামনে এসে দাঁড়ালেই ভয়ে আমাদের লেখা বন্ধ হয়ে যায়! সেখানে স্যার এভাবে এসে বসে থাকতেন ২-৩ মিনিট। জানিনা অন্যরা কি ভাবতো। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন কোনদিনও একটা শব্দ বা কোন পড়া আমাকে বলে দেন নাই। কোন হিন্ট বা একটু করে বলে দেয়া..কিচ্ছু না! আমার প্রতি উনার স্নেহ ভালোবাসা কখনো উনাকে অসততার দিকে নিয়ে যায় নি। যেভাবে ঝট করে এসে বসতেন সেভাবেই ঝট করে উঠে চলে যেতেন। এভাবে প্রতিটা পরীক্ষায় এমন করতেন। ক্লাসে পড়া জিজ্ঞেস করলে না পারলে আবার সবার মত বকা কিংবা পানিশমেন্ট দিতেন। উল্টো অন্যদের থেকে বেশিই দিতেন। এজন্য কত কত অভিমান হত। কোন বায়াসড বা স্বজনপ্রীতি দেখাতেন না।
রোজার সময় পড়া শেষ করে ইফতার এর ওয়াক্ত হয়ে আসলে স্যার যেতে দিতেন না। ছোলা মুড়ি পেয়াজু কিনে আনতেন। দুইজন মিলে কিংবা কখনো কখনো সঞ্জয় সাহা স্যার এসেও আমাদের সাথে যোগ দিতেন। একসাথে ইফতার করতাম। স্যার এর সাথে গল্প গুজব করতাম। কিন্তু স্কুলে গেলে স্যার আরেক রকম!
স্যার এর মাথায় কি চলে চলে শুধু উনি নিজেই জানতেন। একদিন বলে বসলেন, "তোর কাছে আমার মেয়ে বিয়ে দিব!" আমি অবাক আর লজ্জায় শেষ! তাও প্রথমে কথাটা অতটা সিরিয়াসলি নেই নাই। ভেবেছিলাম স্যার এর একটা অভ্যাস আছে মানুষকে কিছু একটা বলে অপ্রস্তুত করে দেয়ার। তাই এমন করেছেন। পরে দেখি উনি আমাকে 'জামাই' ডাকা শুরু করে দিসেন! আমি ভয়ে অস্থির কোনদিন কে শুনে ফেলে আর সারা স্কুল হাসাহাসি পড়ে যাবে! কিন্তু স্যার সবার সামনে বলতেন না। জানতেন বাকিরা শুনলে কি করবে।
জীবনে যাদের থেকে অনেক ভালোবাসা পাওয়ার কিংবা দরকার ছিলো তাদের থেকে অবহেলা পেয়েছি কিন্তু অন্য অনেক মানুষের ভালোবাসা/স্নেহ মমতা পেয়েছি যাদের কাছ থেকে কখনো আশাই করিনি। শুধু একটাই আক্ষেপ ওই ভালোবাসার মানুষগুলো দুনিয়াতে খুব কম সময়ের জন্য এসেছিলেন।
আমি নিজেকে অন্যর জেন্ডার, ধর্ম, আর্থিক অবস্থা, কালার, সেক্সুয়াল প্রেফারেন্স, কথা বলার স্টাইল এসব দিয়ে বিচার করিনা। কোনভাবেই বায়াসড না হবার চেষ্টা করি। কিন্তু একটা বিষয়ে আমি বায়াসড। সেটা হল শিক্ষক/শিক্ষিকা। আমি আমার টিচার্সদের ভালোবাসি। তাদের বিরুদ্ধে কটুকথা শুনতে পারিনা। কেউ কোন টিচারকে ঠাট্টা উপহাস কিংবা বিক্রিত অংগ-ভংগি করে হাসাহাসি করলে খুব মেজাজ খারাপ হয়।
দুনিয়ার সব শিক্ষকরা ভালো থাকুন..সেটা এই দুনিয়া হোক বা পরকালে। এই দোয়া থাকলো।

স্মৃতিচারন ০২ঃ বন্ধুত্বের কি প্রতিদান হয়?


মায়া মমতা ভালবাসা এগুলোর প্রতিদান হয়না। কিন্তু আমরা যখন কারো জন্য কিছু করি অনেকটা আনমনেই একই রকম বিনিময় আশা করে বসি। একটা না বলা চাওয়া থেকেই যায়। ঠিক একই ভাবে কেউ আমাদের জন্য ভাল কিছু করলে আমরা চাই এর বিপরীতে কিছু অন্তত করি৷ কিন্তু কেমন হয় যখন কেউ আমাদের জন্য কিছু করল তার জন্য সারাজীবন মনে দাগ কেটে যায় কিন্তু বিনিময়ে কিছুই করা হয়না!? এই স্মৃতিচারণ সেই বিষয় নিয়ে।
ক্লাস সিক্সে তখন আমি। বয়েজ স্কুল। একটা ফ্রেন্ড রেজাউল। খুব ফর্সা, চিকন আর কিছুটা কোকড়ানো চুল। কিন্তু ওর চেহারার সবচেয়ে আগে যা চোখে পড়ে তা হল সবুজচোখ যাকে আমরা ফাজলামো করে বলি বিলাইর চোখ! পড়ালেখায় ভাল না। প্রায় স্যারের হাতে মার আর বকা। খুব মায়া হল ওকে মার খেতে দেখে। বিশেষ করে সেদিন, যেদিন স্যার মারবে বলে বেত তুলল কিন্তু ও হাত সরিয়ে ফেলায় মিস হয়ে গেল মার! স্যার রেগে গিয়ে আরো অনেক মারল সেদিন। একদিন পাশে বসায় ক্লাস শুরুর আগে একটা পড়া বুঝায় দিলাম। সৌভাগ্যবশত স্যার পড়া জিজ্ঞেস করায় মোটামুটি উত্তর দিতে পারল অতঃপর মার থেকে বাচল! সেই থেকে ওকে পড়াতাম। খেয়াল করলাম পড়ালে ঠিকই পারে। টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় মোটামুটি পাশ করল। কি খুশি সেদিন। আমিও বুঝলাম কাউকে পড়াতে ভাল লাগে আমার।কদিন ধরে দেখি মুখ শুকনো করে রাখে। বলল ওর বাবার চাকরি চলে গেছে। বাসায় বাজার নাই। প্রতিদিন নাকি আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খায়। কি খারাপ লেগেছিল ওইদিন ওর কথা শুনে। সেদিন বাসায় গিয়ে যখন আব্বু, আম্মুকে অভিযোগ করছিলেন মুরগির মাংসের সাথে প্রতিবারই কেন আলু দেয়া লাগবে বলে তখন নিজেকে অনেক ছোট মনে হচ্ছিল। কারো একমাত্র খাবারই আলু। আর আমরা অভিযোগ করছি সেটা নিয়েই। বুঝলাম এই পৃথিবী কতটা আনফেয়ার!
কয়েকমাস স্কুলের বেতন দিতে পারছেনা বলে স্যার প্রতিদিন বকা দিতেন। একদিন দেখি ও ক্লাসে আসে নাই। পরের দিন ও না। এভাবে প্রায় 2 সপ্তাহ আসল না। পরে একদিন আসলো ক্লাসে। কেন আসেনাই জিজ্ঞেস করায় বলল ওর বাবা সহ কদিন ধরে ভ্যান চালিয়েছে। তাই ক্লাসে আসতে পারে নাই। কিন্তু বেতনের টাকা জোগাড় হয়নি। ওই সুন্দর সবুঝ চোখে রাজ্যের কষ্ট কিন্তু মুখে হাসি রাখার প্রানান্ত চেষ্টা! খুব মায়া হল। তাই অনেকদিন ধরে জমানো 500 টাকা ওকে দিয়ে দিলাম যেন বেতন আর পরীক্ষার ফি দিতে পারে। এই টাকাটা অনেকদিন ধরে চেষ্টা করে জমানো। আমার হাতে কেন জানি টাকাই থাকেনা। খরচ করি কিভাবে তাই জানিনা। শার্লক হোমসের রচনা সমগ্র কিনব বলে, আর ব্যাডমিন্টন এর ব্যাট কিনব বলে জমিয়েছিলাম। টাকাটা নিতে চাইছিলনা। আবার না নিয়েও উপায় ছিলনা তখন ওর।
এই টাকাটা নেয়ার আগ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু পরের দিন থেকে খেয়াল করলাম ওর ব্যাবহার অন্যরকম। কিছুটা বস আর এমপ্লয়ি এর রিলেশনের মত হয়ে গেল! আমি বেঞ্চে বসার আগে কাগজ দিয়ে ধুলো মুছে দিতে লাগল। কিংবা সিংগাড়া খাওয়ার সময় আলুর টুকরা আমার হাটুতে পড়লে পানি দিয়ে দাগটা তুলে দেয়ার কি চেষ্টা ওর! আমার সব কথায় হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাত। আমি বিরক্ত হতাম খুব। কিভাবে যেন আমাদের বন্ধুত্বটা 'বস আর এমপ্লয়ি' এর মতন বদলে গেল। টাকাটা ফেরত দিতে পারছেনা বলে অন্যভাবে প্রতিদান দেবার প্রানান্ত চেষ্টা ওর। আমি টাকাটা ওকে ফেরত দেবার জন্য দেই নাই। তাও এমন ব্যবহার ভাল লাগেনি। আমি আস্তে আস্তে কিছুটা সরে আসতে থাকলাম। ও মনে হয় বুঝতে পেরেছিল। সেজন্যেই মনে হয় আর পড়া বুঝতে আসতনা। পরীক্ষায় কত পেয়েছে জিজ্ঞাসার উত্তরও দেয়নি অভিমান করে।
এভাবেই যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার স্কুল শেষে ক্রিকেট খেলায় ফিল্ডিং করার সময় পা দিয়ে বল আটকাতে গিয়ে পেন্টের নিচে ইয়া বড় করে ছিড়ে গেল! আমার সাথে এরকম প্রথমবারের মত হল। খুব লজ্জা আর আনইজি ফিল হচ্ছিল। একতো বল আর টেপ কিনতে গিয়ে টাকা শেষ। বাসায় হেটে যাওয়া লাগবে এই অবস্থায়! তারউপর পেন্ট ছিড়ে গেসে। বাসায় আম্মু কি বলে সেই ভয়। কি করব ভাবছি। সেই সময় রেজাউল ওর গায়ের শার্টটা খুলে আমাকে দিয়ে বলল তোর কোমড়ে পেছাই নে। আর একটা রিকশা ঠিক করে টাকা দিয়ে দিল রিকশাওয়ালাকে। আমি ঘোরের মধ্যে রিকশাতে উঠে গেলাম কিছু না বলেই। রিকশা চলছে। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি ও বড় বড় ছিদ্র ওয়ালা ছেড়া সেন্টো গেঞ্জি গায়ে অন্যদের সাথে হেটে বাসায় ফিরছে। নিজেকে আবার অনেক ছোট মনে হল! আমার জন্য এভাবে বাসায় ফিরছে ছেলেটা। একবারও ভাবেনি এভাবে রাস্তায় হেটে বাসায় যাচ্ছে মানুষ কিংবা ওর মা কি বলবে! আরো খারাপ লাগলো এই ভেবে যে আমি ওর থেকে একটা দুরত্ব তৈরি করেছিলাম!
পরেরদিন শুক্রবার স্কুল বন্ধ। কত কি ভেবে রেখেছিলাম শনিবার গেলে ওকে কি বলব। কি বলে ধন্যবাদ দিব।প্রথমে নিজের হাতেই ওর শার্ট ধুয়ে নীল দিলাম। আম্মুকে বলেছিলাম শনিবার থেকে টিফিন নিব। এই কথা শুনে আম্মু অবাক! কখনই টিফিন নিতামনা আমি। ওর জন্যই আসলে নেয়া। একটা রুটিন করলাম ওকে কি কি সাব্জেক্ট পড়াবো। আব্বু খাতা কলম একবারে অনেকগুলা কিনে রাখত। সেখান থেকে দুইটা নতুন খাতা আর কলম নিলাম রেজাউলের জন্য। খুব এক্সসাইটেড হয়ে স্কুলে গেলাম সব গিফট নিয়ে। কিন্তু.. ও আসলোনা ক্লাসে। পরেরদিনও তাই। আসলো না। এরপরের দিনও না।
আর কখন আসেনি ক্লাসে ও।
কখনই আর বলা হয়নি দুরত্বের জন্য সরি। কিংবা বন্ধুত্বের জন্য ধন্যবাদ। গিফট গুলা দেয়া হয়নি। ওর তেমন কোন বন্ধু ছিলনা। একজন বলল ওরা গ্রামে চলে গেসে।
আর কোনদিন দেখাও হয়নি। ওর এতবড় উপকারের প্রতিদান দেয়া হয়নি। রাস্তায় হাটার সময় সবুজ চোখের কাউকে দেখলে আগ্রহ করে তাকিয়ে চেহারা দেখে বুঝার চেষ্টা করি রেজাউল কিনা। জানি চেহারা বদলে গেছে কিন্তু ওই চোখ জোড়া দেখে আমি ঠিকই চিনে নিব!
জানিনা কোথায় আছিস। আদৌ বেচে আছিস কিনা। কিন্তু তোর কথা মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে। ওই সবুজ চোখ আর ফেকাসে হাসি। ভাল থাকিস দোস্ত যেখানেই আছিস। তোর ওইদিনের উপকার আমি কখনই ভুলবনা।

ভয় আর ভালোবাসা -- PART 03

  PART : 03  কবির চলে যাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না শামীমা ম্যাডাম। ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওই টাকাটা দিয়েছিলো কবিরের ভালো...