আজ শনিবার, ঘুম থেকে উঠেই আবিদের এটা মনে হল।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই হন্তদন্ত হয়ে অফিস যাওয়ার অভ্যাস এখনো যায়নি। তাই চোখ মেলেই মনে হয় দেরি হয়ে যায়নি তো! সকাল বেলাটা লিয়াকত স্যার এর ত্যাড়া মার্কা কথা দিয়ে শুরু করাটা কখনো চায়নি সে। এখন আর অবশ্য শুনতে হবেও না। গুনে গুনে চার শনিবার আগেই যে দুইটা 'না' বলে দিয়েছে তার একটি হল লিয়াকত স্যার কে। অবশ্য সেদিনও লিয়াকত স্যার এর গলা এতোটুকু নরম হয়নি। স্যার এর কথায় এতটুকু আন্তরিকতা ছিলো না। একবারের জন্যও এমন কোন কথা বলেননি যা দিয়ে বুঝায় আবিদ তাদের অফিসের জন্য প্রয়োজনীয় কেউ। যেন সে না আসলেই বাঁচে! আসলে ওদেরই লাভ আবিদ না আসলে। করনা কালে প্রথম দুই মাস এর বেতন এক মাস হিসেবে পেয়েছে। এরপর অফিস থেকে বেতন দেয়াই বন্ধ করে দিল। "সেলস নাই তো বেতন কেমনে দিব..বউ এর গয়না বিক্রি করে?", " কোন রকম চলেন আগামী বছর থেকে সব ঠিক মত পাবেন" এই হল লিয়াকত স্যারের কথা। চারটা মাস মেসে খেয়ে না খেয়ে ধার দেনা করে চলেছে। বাসা থেকে টাকা নেয়া যাবেনা। বড় ভাই সংসার চালায়। থাকে শহরের অন্য এক প্রান্তে। মা-বাবার কাছে টাকা থাকেনা। উনারাও থাকেন বড় ভাইয়ের সাথে। আবিদ মাঝে মাঝে বিকাল করে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসে। মা বলে রাতে খেয়ে যেতে। কিন্তু আরো একটা মানুষকে খাওয়ানোর জন্য ভাবীর বিরক্ত চেহারা দেখতে চায়না সে। আর বেশিক্ষন থাকলে মায়ায় পড়ে যাবে। মায়ার বাঁধন কঠিন বাঁধন। আটকে গেলে পরে কষ্ট পেতে হয়। যেমন এখন পাচ্ছে 'মৌ' কে না বলে। এইটা হল একমাস আগে বলা দ্বিতীয় না। তিন বছরের সম্পর্কের ইতি টানা হয়ে গেল।
শুরুটা যদিও হয়েছিল মৌ-এর ইচ্ছায়। মাস্টার্স এ থাকতে বন্ধুত্ব, নোট শেয়ার, লাইব্রেরিতে পড়া বুঝানো, একসাথে একটু আধটু শপিং এ যাওয়া ফাইনাল সেমেস্টারে এসে প্রেমে বদলে গেল। আবিদ রাতদিন মৌ এর প্রিপারেশন আর পরীক্ষার টেনশন করে পার করল। ফলাফল আবিদের রেসাল্ট আশানুরূপ হলনা। এই নিয়ে বন্ধুদের হাসাহাসি আজ অব্দি শুনতে হয়। যতটা আগ্রহ আর ভালোবাসা নিয়ে মৌ এসেছিল ঠিক যেন ততটাই দ্রুত ওর ভালোবাসা ফুরিয়ে যেতে লাগলো! একসময় নিজেই মৌ এর মেসেজ সিন না করে ফেলে রাখতো। নিজের কাজ কিংবা পড়া টুকু শেষ করার জন্য। কারন জীবনে অনেক টাকা না হলেও স্বাচ্ছন্দ্যেময় ও সম্মানজনক একটা চাকরি চেয়েছিল। পরে তার উল্টোটা হওয়া শুরু করল। বাইরে ঘুরে বেড়ানোটাও কমে গেল কারন একটা প্রাইভেট ব্যাংকে ওর চাকরি হয়ে গেল। প্রাইভেট ব্যাংকের ডিমান্ডিং ওয়ার্ক আওয়ার এর উসিলায় আবিদের কলগুলো মিসড কলের লিস্টে চলে যেতে লাগলো। মেসেজগুলোর রিপ্লাই আসলো 'I'm busy' অথবা 'I'll call you later' টাইপ যা মোবাইল থেকে অটোমেটিক সেট করা। অফিস শেষে ক্লান্তর অযুহাতে দেখা করা হয়না। শুক্রবার ঘরের একশ কাজের আর মেহমানের অযুহাত। এমন হল ব্যাপারটা যেন মৌ যত দ্রুত সরে যেতে শুরু করলো আবিদ যেন ততটাই বেশি ভালোবাসায় পাগল হয়ে যেতে শুরু করলো! এটা জেদ ও হতে পারে। একারনে ওর মনে সন্দেহ ভর শুরু করল। মৌ এর অফিসে সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থাকা, ওর ফেসবুকে কার কার ছবিতে লাভ রিয়েক্ট দিয়েছে, কি কি কমেন্ট করেছে সব দেখা শুরু করলো। এই নিয়ে ঝগড়াঝাটি, ব্লক করা একজন আরেকজনকে। এভাবে অনেকবার হল। আবিদ খেয়াল করল যখনি ঝগড়া শেষে কথা বন্ধ হয়। একদিন পরেই ওর মন আকুপাকু করে আবার কথা বলার। মৌ এর কোন আগ্রহ নাই। আবিদই শুধু প্যাচ আপ করার জন্য লেগে থাকে মৌ এর পেছনে। যেন সব ঠেকা আবিদের! কখন যেন সম্পর্কে শুধু আবিদই রয়ে গেল! একদিন বেসরকারি এক প্রতিষ্টানে আবিদের চাকরি হল। যদিও ওর পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মিল নাই। আবার বেতন ও কম। তাও রাজি হয়ে গেল এই ভেবে যে মৌ এর সাথে ঝগড়া আর ওকে হারিয়ে ফেলার চিন্তা থেকে কিছু সময়ের জন্য হলেও দূরে থাকবে। কিন্তু হল উল্টো।
চাকরি হবার সুসংবাদ টা সারপ্রাইজ হিসেবে দিতে চেয়েছিল আবিদ। যেই ভাবা সেই কাজ। সন্ধ্যায় ওর অফিসের সামনে ফুল হাতে দাড়িয়েছিল। যদিও এসব ফুল দেয়া নেয়া আবিদের পছন্দের ব্যাপার না। তার উপর মানুষ বার বার তাকায় বলে অস্বস্তি বোধ করে। তাও সেদিন সব ঝেড়ে ফেলে ফুল নিয়ে দাড়িয়ে ছিল। আজ স্পেশাল ডে বলে কথা! ফোন করে জেনে নিয়েছে ১৫ মিনিট পর বের হবে। ১৫ মিনিটের আগেই বের হল মৌ উজ্জ্বল হাসি মাখা মুখ নিয়ে কিন্তু সাথে ওই বড় ভাই যার সুপারিশে এই চাকরিটা হয়েছে। ওর সুন্দর হাসি মাখা মুখ আর সাথে সুদর্শন ভদ্রলোক। কি অদ্ভুত কষ্ট হল আবিদের। কতদিন দেখেনা মৌ এর এমন হাসি। সব সময় কপট রাগ আর বিরক্তি থাকে মৌ এর মুখে যখনি ওর সাথে বাইরে যায় কিংবা দেখা হয়। হাজারটা চিন্তা মাথায় আসলো। ওই লোক কি সব সময় আসে মৌ এর অফিসে। যদিও বড় ভাইয়ের মত বলে কিন্তু আসলেই কি সেরকমই সম্পর্ক? আর কত কত? তবে সবচেয়ে বেশি মনে গেঁথে গেল মৌ এর এমন প্রান খুলে হাসি। যে হাসি দেখে একসময় সব কষ্ট আর হতাশা ভুলে যেত আজ সেই হাসিই তার ঘুম হারাম করে দিচ্ছে। না সেদিন দেখা করার মানসিক শক্তি জুটাতে পারেনি। চোখ ফেটে কান্না আসতে লাগলো। চোখের পানি ওই ফুলগুলোর উপর পড়ল আর পড়ে এমনভাবে রইল যেন দোকানী মাত্র পানি ছিটিয়ে দিয়েছে তাজা রাখার জন্য। পেট খারাপের অযুহাত দিয়ে কোন রকম পালিয়ে এসেছে মেসে। এক ঘন্টা শাওয়ার ছেড়ে ভিজল, কান্না জলে ভিজে একাকার হল। চোখ লাল হল। মাথাও ধরল। আজ শেষ করে দিবে সব সম্পর্ক। এই ভেবে কল দিল মৌ কে। কল ধরেই মৌ এর হাসি হাসি গলা। অনেক খুশি সে। কারন ওই বড় ভাই নাম মাহফুজ যার সুপারিশে মৌয়ের চাকরি হয়েছে উনি ওদের ব্রাঞ্চে সেকেন্ড ম্যানেজার হিসেবে জয়েন করছেন। পাঁচ মিনিট মৌ উনার গুনগান আর উনি কত মজার সে কথা অনর্গল বলে গেল। আবিদও শুনে গেল। অনেকদিন পর মৌয়ের আনন্দময় গলা শুনতে পেয়ে ভালো লাগছিল। না আবিদ সেদিনও কিছু বলতে পারলো না। বলল শুধু চাকরি খবর। শুনে মৌ কি খুশি হল নাকি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এই ভেবে যে ওকে দিনে রাতে আগের মত বিরক্ত করবে না, কে জানে। চাকরিতে ঢুকে কথা আর যোগাযোগ আরো কমে গেল। দিনে লিয়াকত স্যারের কটাক্ষ করে কথার খোঁচা আর রাতে গিয়ে দেখে মৌ এর অফিস পার্টি কিংবা কলিগের সাথে বাইরে খেতে যাবার ছবি। কোনটা তে কষ্ট বেশি আবিদ বুঝে উঠেনা। সব একই লাগে মেসের বুয়ার হাতের রান্নার মত। এভাবেই চলতে থাকলো কয়েক মাস।
এরপর এলো করনা। লকডাউন। অফিস বন্ধ। মৌ এর ফোন বিজি আর ওয়েটিং এর পালা এল। আগে কেটে দিত ব্যাস্ত থাকলে। আর এখন থাকে ওয়েটিং। ওয়েটিং কেন থাকে জিজ্ঞাসা করলে বিরক্ত হয় মৌ। মাহফুজের ছবিতে এখন মৌ লাভ রিয়েক্ট দেয়। মাহফুজ ও তাই। মাহফুজের মায়ের সাথে মৌ ভিডিও কল দিয়ে কথা বলে আর মাহফুজ সেটা স্ক্রিনশট নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। আহা! ওদের দেখে আবিদের কেন জানি নিজের মায়ের কথাই বার বার মনে পড়ে। মায়ের মত কেউ তো ভালবাসেনা ওকে। করনার কারনে মাকে দেখেনা অনেকদিন। ভাই-ভাবীর নিষেধ এই করনা কালে যেন আবিদ না আসে বাসায়। যদিও মা-বাবা কত বয়স্ক আর ওদের প্রানের ঝুঁকির দোহাই দিয়েছেন ভাবী। আসলে ওরা ভয় পাচ্ছে নিজের আর ওদের ছোট মেয়েটার জন্য। আবিদ বুঝে সব। কিছুই বলেনা। সবাই সবার মত ভালো থাকুক। একদিন ওর সবকিছু হবে। তার ভাগের পাওনা সে বুঝে পাবে। এই সব সান্তনা দিয়ে মনকে আর কতটুকুই বুঝানো যায়? এইদিকে অফিস থেকে বেতন দেয়া বন্ধ। ওইদিকে মৌ আরো শত মাইল দূরে চলে গেছে। আর পাশের রুমের তৌহিদ এসে দেশের যে কি খারাপ অবস্থা হতে চলেছে তার বর্ননা।
একদিন ধৈর্যের বাধ ভাঙলো। পর পর দুইটা কল করলো। প্রথমে লিয়াকত স্যার কে। পরেরটা মৌ কে। দুইজনকেই বলল সে আর পারছে না। বুঝতে পারলো ওরা দুইজনই খুশি হয়েছে। খুশি থাকুক। করনার এই সময়ে খুশি থাকাটা জরুরি।
বন্ধু তৌহিদ। একটু স্বাস্থ্যবান। গালে সুন্দর দাড়ি। শিশুতোষ একটা চেহারা। একটু পর পর লুংগিটা খুলে ঠিক করে পরবে। লুংগি পড়ার সময় গায়ের সেন্টো গেঞ্জিটা দাতে কামড়ে ধরে রাখে। ফলাফল ওর লোম ভর্তি পেট দেখা। মায়া মায়া ভাব আছে ওর মধ্যে। ওর যদিও একটা দিক খারাপ লাগে সেটা হল হা-হুতাশ করা সব সময়। ফেসবুক খুঁজে খুঁজে সব নেগেটিভ নিউজ সে দেখবে এবং শেয়ার দিবে। আর এসে আবিদকে সব বলবে। তবে রান্না করে ভাল। ফার্মের মুরগীও এত ভালো রান্না করে যে কোন গন্ধ লাগেনা। খেতে অমৃত লাগে। আরেকবার ভাত নেয়া যায়। ওকে সব কষ্ট শেয়ার করতে ইচ্ছা হয় আবিদের কিন্তু করেনা। বেচারা নিজেই সৎ বাবার অনাদর আর কঠিন শাসনে বড় হওয়া একটা ছেলে। একটা ফার্মাসিটেক্যাল কোম্পানিতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্ন্টেটিভ হিসেবে ছিল। করনা তে চাকরি চলে গেছে। এই নিয়ে মাঝে মাঝে ওর হতাশা চেঁপে বসে। আর হতাশ হলেই ওর প্রিয় গল্প করে। কেন ছাত্রীর সায় থাকার পরও একা বাসা পেয়েও ছাত্রীর সাথে শারিরীক সম্পর্কে জড়ায়নি। আজ যদি তাই করত তবে বড়লোক এক শশুর পেত আর টাকার কোন চিন্তাই করতে হতনা! আর বলে "ভাইরে দুনিয়াতে ভাল মানুষির দাম নাই"।
আরেকটা ভালো দিক হল তৌহিদ কখনই এক ঘন্টার বেশি হতাশায় থাকেনা। আবার ঠিক হয়ে যায়। মনে হয় একটু করে কেঁদে আসে টয়লেট থেকে। আবিদ ভাবে ওর ও তাই করা উচিত। কান্না করা। চোখের পানিও এখন সহজে আসে না।
ও এসেই বলবে এটার ব্যাবসা করা উচিত ওইটার ব্যাবসা করা উচিত। ছয় মাস করে টাকা হলে ওই ব্যাবসা থেকে অন্য কোন ব্যাবসাতে চলে যাবা।
আজকাল আবিদকে প্রায় সময় বুঝায় রাস্তার পাশে টেবিল নিয়ে বিভিন্ন ইলেকট্রনিকস জিনিস বিক্রি করার ব্যাবসা করতে। বিশেষ করে এই সময়ে সব কিছু অনলাইনে হচ্ছে। বাচ্চাদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে অফিসের মিটিং আর স্বাস্থ্যসেবা। এজন্য অনেক ইলেকট্রনিকস জিনিসের প্রয়োজনীয়তা এসছে। আবিদ লোকলজ্জার কথা ভেবে করে না। কেউ যদি দেখে ফেলে কি যে লজ্জা লাগবে ভাবতেই আবিদ পিছিয়ে যায়। এদিকে অনেক টাকা ধার দেনা হয়ে গেছে। আসলে তৌহিদ নিজেও একা একা শুরু করতে লজ্জা পাচ্ছে। সাথে কাউকে চাইছে।
ভাবীর রক্তচোখ, চাকরি ছেড়ে দেয়ার কারনে বড় ভাইয়ের বকা, মা-বাবার হা-হুতাশ সব সহ্য করে ভাইয়ের কাছে টাকা চাইলো। বেতন না পেয়েও এতদিন চলেছে আবিদ। এরপর আরো একমাস গেল। সব শুনে ভাইয়ের মন একটু হলেও গললো। ভাই টাকা দিলেন। যদিও ভাবী এইটা শুনিয়ে দিলেন উনার জন্য মামাতো ভাই বিদেশ থেকে নাকি পাঠিয়েছে এই টাকা। দ্রুত ফেরত দেয়ার জন্য বলা আরকি। এইটুকু আবিদ বুঝে।
সবকিছু বন্ধু তৌহিদ করল। দরকারী মালপত্র কিনলো। কদিন আবিদকে নিয়ে রাস্তার পাশের হকারদের সাথে কেনাকাটা করার বাহানায় কথা বলে নিল। কোথায় কোন সময় বসলে ভালো বেচাকেনা হবে সেটা ঠিক করলো। তৌহিদের উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়ে ভালো লাগছে আবিদের। নতুন কিছু নিয়ে ব্যাস্ত দুই বন্ধুর আলোচনা। আবিদ খেয়াল করল এসব নিয়ে ব্যাস্ত থেকে ওর মৌ এর কথা মনে পড়েনি দুই দিন! এই ভাবনা নতুন ব্যাবসার প্রতি ভালোলাগা আর আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দিল। তৌহিদের শিশুতোষ উৎসাহ আস্তে আস্তে আবিদের মধ্যেও ছড়িয়ে গেল।
আজ প্রথম দিন। তৌহিদ সব শিখিয়ে দিয়েছে। রিকশা থেকে বস্তা ভর্তি মালপত্র নামালো ফোল্ডিং টেবিল সমেত। ভাড়া নিয়ে রিকশাওয়ালা চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল। রিকশাওয়ালা যেন বুঝতে না পারে আবিদ একজন হকার। কোনভাবেই মুখের মাস্ক সরে যেতে দিচ্ছেনা আবিদ। সবচেয়ে পুরান টি-শার্ট টা পড়ে এসেছে যা অনেক দিন পড়ে নাই। চায়না প্রথম দিনই কেউ ওকে দেখে ফেলুক! আর যদি মৌ দেখে ফেলে তবে তো মাথা কাটা যাবে একদম। মৌ এর চিন্তাটা আসা একদম উচিত হয়নি। এইভেবে নিজের উপরই বিরক্ত হল আবিদ। ইচ্ছে করে মোড়ের থেকে দূরে টেবিল সাজালো। প্রথম দিন বলে স্বাচ্ছন্দ্যেবোধ করার জন্য একটু সময় দিতে চায়। কাস্টমারকে ডাকাডাকি করতে চায় না। তাই একটা কাগজে "২ পিস ১০টাকা" লিখে নিয়ে এসেছে। সেটা মাস্কের বড় প্যাকেটের উপর রাখলো। সবকিছুর প্রাইস্ট্যাগ রেডি করে এনেছে। প্রতিটা জিনিসের প্রাইসট্যাগ প্রতিটা জিনিসের সাথেই সুন্দর করে সাজিয়ে রাখলো যেন বেশি কথা বলতে না হয়। আসলে আবিদের ভয় পরিচিত কেউ না দেখে ফেলে!
ঠিক করেছে আজ বেশিক্ষণ থাকবে না। কিন্তু প্রথম দিন হিসেবে ভালোই বিক্রি করল। অদ্ভুত আনন্দ হল। এজন্য মাঝে একবার তৌহিদকে কল দিয়ে খোঁজ নিল ওর কেমন চলছে জানতে। যতক্ষন থাকবে ভেবেছিল তার চেয়ে বেশিই থাকলো যেহেতু বিক্রি ভালোই হচ্ছে আর তৌহিদও মানা করলো এত তাড়াতাড়ি যেতে। এই কিছুদিনে তৌহিদের সাথে বন্ধুত্বটা আরো গভীর হয়েছে। ওর কথা ফেলতে পারলো না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হচ্ছে। চারিদিকে সোনালী আভা। আজকে আকাশটা সুন্দর লাগছে। অন্যদিন থেকে একটু বেশি ভালো লাগছে। আহা! আবিদ আনমনা হয়ে আকাশটা দেখতে লাগলো।
হঠাৎ পাশের খিচুড়ি বিক্রি করা ভ্যানওয়ালার ছেলে বলল "মামা পুলিশ আইতাসে, সবরে তুলি দিতেসে...তারাতারি ভাগেন!"
আবিদ তাড়াহুড়ো করে সব বস্তা ভরতে শুরু করলো। তাড়াহুড়ায় মাস্কের "২ পিস ১০টাকা" লেখা কাগজটা পড়ে গেল। আবার লেখা যাবে ভেবে আবিদ কাগজটা তোলার প্রয়োজন মনে করলোনা।
আবিদ মাথা নিচু করে সব গোছাচ্ছে। এই সময় এক লোক এসে মাস্কের দাম জিজ্ঞাসা করলো। ও বসে মাথা নিচু করে জিনিস গোছানোর মধ্যে থেকেই মাস্কের দাম বলল। লোকটা শুনতে পায়নি। আবার বলল "দুইটা কত দিব?”। এমনিতেই মাস্ক সরে গেছে অনেকটা তার উপর ও পুরাটা সরিয়ে বলল "১০টাকা ভাই"। লোকটা কে পরিচিত মনে হচ্ছে। পর মুহূর্তে চিনে ফেলল। মাহফুজ!
যদিও মাহফুজ এর সাথে কখন পরিচয় হয়নি আবিদের। তাও ওকে কোথাও দেখে থাকবে যেহেতু মৌ এর সাথে ফেসবুকে অনেক ছবি ছিল। কিন্তু আবিদের মনে হল মৌ ও থাকতে পারে মাহফুজের সাথে। তাই আনমনেই মাস্ক উঠিয়ে ঠিক করে ডানে তাকিয়ে বামে তাকাতেই দেখে মৌ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। মৌ-এর দৃষ্টি স্পষ্টতই বলে দিচ্ছে চিনতে পেরেছে আবিদকে। হঠাৎ সবকিছু যেন শুন্য মনে হতে লাগলো আবিদের। একটু আগের যানবাহন আর মানুষের আওয়াজে ভরপুর এই ব্যাস্ত মোড় কেমন যেন নিঃশব্দ লাগলো। সংবিৎ ফিরল মাহফুজের " এই নিন ১০টাকা" বলায়। মাহফুজ একটা মাস্ক মৌকে দিয়ে আরেকটা নিজে পড়ে সিএনজি ঠিক করতে লাগলো। মৌ, মাহফুজকে দামদর করতে না দিয়েই উঠে বসল সিএনজি তে। আবিদ উল্টোদিকে ফিরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। সব শুনতে পেল। ওভাবেই রইল যতক্ষন না ওই সিএনজিটা চলে গেল।
গোছানো শেষ। আজকে ভালোই বেচাকেনা হল। কাল আরো ভালো হবে সেই আশা মনে। অগোছালো করে রাখা টাকা পকেট ফুলিয়ে রেখেছে। একটা রিকশা ঠিক করে বাসার পথে রওনা দিল। মাস্কটা খুলে ফেলল। যে না দেখার সেই যখন দেখে ফেলেছে তবে এই মাস্কের আর প্রয়োজন নাই। যে ভয় পেয়েছিল আজ প্রথম দিনই তা হয়ে গেল! একটু আগের দৃশ্য বার বার সিনেমার ফ্লাশব্যাক এর মত ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। মনে মনে বলছে "বিকাল পাঁচটায় মৌ এখানে কেন?" "ওর তো অফিসে থাকার কথা"। মনে পড়ল ব্যাংক শনিবার বন্ধ। রিকশাওয়ালা বলল " মামা কি কন বুঝিনা আফনের কতা!"
আবিদ আনমনে বলল " আজ শনিবার"।


