এমনিতেই একটা ব্যাক্তিগত কারনে কয়েকদিন ধরেই প্রিয় স্যার এর কথা মনে পড়ছিল। বিশেষ করে একটা ভিডিও দেখলাম অনলাইন ক্লাসে এক ছাত্র শিক্ষককে নোংরা ভাষায় গালি দিল দেখে খুব খারাপ হল মনটা। অনেক স্মৃতি আর ভাবনা মাথায় ঘুরপাক খেলো। আমি চাঁপা স্বভাবের। এজন্য কাউকে মনের কথা বলা হয়ে উঠে না। তারউপর গুছিয়ে সুন্দর ভাবে কথা বলতে জানিনা বলে কেউ কথা শুনার আগ্রহও দেখায় না। আমার মত মানুষের জন্য একমাত্র মাধ্যম হল লেখা। তাই ভাবছিলাম কিছু লিখি প্রিয় স্যার কে নিয়ে।
There are two types of people in the world. One who speaks and express their inner thoughts so well that they do not need to write to anyone. In fact they find it extremely difficult to write down their thoughts on a paper. And second who are totally opposite of the first category. They are only comfortable in writing down their thoughts. I am 2nd!
Sunday, September 27, 2020
স্মৃতিচারন ০১ঃ সময়ের সাথে সাথে শিক্ষকের প্রতি ভালোবাসা কি চলে যাচ্ছে?
বলছি আমার প্রিয় কবির স্যার এর কথা। মানুষটা মৃত কিন্তু আমার প্রতি উনার ভালোবাসা, মায়া আর কাজের ক্ষেত্রে উনার সততার আদর্শের শিক্ষা আমার কাছে উনাকে চিরজীবী করে রেখেছে। প্রচন্ড রাগের একটা মুখোশের আড়ালে একজন খুব মায়াময় মানুষ। বেশির ভাগ মানুষ উনার রাগী রুপ দেখেছে এবং সেভাবেই মনে রেখেছে। উনার মায়া করার রুপ খুব কম মানুষ জানে। ভালো একজন শিক্ষকের পাশাপাশি খুব ভালো একজন মানুষ। জানিনা কোন কারনে এবং কেন এত এত স্নেহ আর মায়া করতেন আমাকে। মনে আছে স্যার এর বাসায় পড়তে যেতাম বিকাল 3 টায়। স্যার আরেকজন লোকসহ রুম শেয়ার করে থাকতেন। একই কলোনি তে থাকার কারনে আমি ১৫-২০ মিনিট আগেই চলে যেতাম। স্যার আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন কিভাবে উনার বাসায় দরজা বাইরে থেকেই খুলে ফেলা যায়! বলতেন "কাউকে বলবি না কিন্তু আবার!" দুপুরে আমি গিয়ে দেখতাম স্যার ঘুমাচ্ছেন। স্যার এর খাট এর পাশে চুপচাপ বসে থাকতাম ৩টা বাজার জন্য। মাঝে মাঝে জেগে যেতেন। চোখ মেলে একবার তাকিয়ে দেখে বলতেন "আব্বা আসছস তুই?"। হ্যা..উনি আমাকে 'আব্বা' ডাকতেন। কিন্তু অন্যদের সামনে ডাকতেন না! কখন থেকে এবং কেন ডাকতেন আমার মনে নাই। আমি 'জ্বি আসছি স্যার' বললে উনি আমার পিঠে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন ”আরেকটু ঘুমাই..সবাই আসলে ডাকি দিস"। কোনদিন আমি আসলে উঠে যেতেন আর উনার বাড়ির কথা বলতেন। কোনদিন যদি ইলিশ মাছ রান্না হয় আর যদি খেতে কম ঝাল আর মজা হয় তাহলে সেদিন কি যে খুশি! বলতেন
"চারটা ভাত খা..আজকে বুয়া ইলিশ মাছ অসাধারন রান্না করসে!"
আমি বলতাম, " স্যার আমি এইমাত্র ভাত খাই বের হইসি।"
স্যার বলতেন, "আরে খা..পারবি, আমি কাঁটা বেছে দিব"। স্যার কাঁটা বেছে বেছে একটা কাগজের উপর সুন্দর করে রাখছেন..এখনো চোখের সামনে ভাসছে। যেদিন ইলিশ মাছ রান্না হবে সেদিন দুপুরে স্যার এর বাসায় গিয়ে আবার ভাত খাওয়া একটা নিয়ম হয়ে গিয়েসিল।
কি শুনে মনে হচ্ছে না অনেক বয়স্ক একজন মানুষ? না, উনি এখন আমার যা বয়স সেরকমই!
যেদিন স্যার এর আকদ হল রাংগুনিয়াতে তার কয়েকদিন পর স্যার এর বাসায় পড়তে গেলে বললেন,
”একটা কথা আছে, কাউকে বলবিনা কিন্তু...আমি বিয়ে করসি!"
ক্লাস এইটের হলেও আমি এতটুকু বুঝি যে বিয়ে স্বাভাবিক একটা জিনিস। আমি অবাক হয়ে বললাম "স্যার সবাই জানলে কি হবে!?"
ছোট বাচ্চার মত লাজুক হাসি দিয়ে বললেন, "আর কাউকে এখনো বলি নাই যে সেজন্য!" পরে বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে বাসায় এসেছিলেন দাওয়াত এর কার্ড দিতে।
আরেকবার স্যার এর বাসা থেকে পড়ে ফেরার সময় উনার বিল্ডিংয়ের সিঁড়িতে আমের চাঁমড়াতে পা পিছলে পড়ে খুব ব্যাথা পেয়েছিলাম। মাথায় ব্যাথা পেয়েছি বলে সবাই ধরে স্যার এর রুমে নিয়ে আসলো। স্যার আর উনার রুমমেট আমার মাথায় পানি দিলেন। উনার গামছা দিয়ে পরম যত্নে মাথা মুছে দিলেন। উনার গামছার গন্ধ এখনো অনুভব করার চেষ্টা করি আর উনার সেই চিন্তিত ও মায়াভরা মুখ নিয়ে 'তুই ঠিক আছোস? বার বার কানে বাজে। উনার মত এখন আর কেউ জিজ্ঞেস করেনা আমি ঠিক আছি কিনা। এজন্যই কষ্টের দিনগুলোতে উনাকে অনেক বেশি মিস করি।
পরীক্ষার সময় আমি আর সবার মত ব্যাস্ত লিখা নিয়ে। স্যার কখন জানি ক্লাসরুমে এসে আমার একদম পাশে এসে আমার কাঁধে হাত দিয়ে বসে পড়তেন। মাঝে মাঝে ওভাবেই চুপচাপ বসে থাকতেন আর দেখতেন আমি কি লিখি। আবার মাঝে মাঝে কানের কাছে ফিসফিস করে বলতেন,
"আব্বা প্রশ্ন কেমন হইসে...পারবি তো?”
"পড়ালেখা করেছিস তো..নাকি ফাকিবাজি করসস?"
"খারাপ রেজাল্ট করলে আমার কাছে পড়তে আসবিনা কিন্তু!"
কোনরকমে বলতাম "জ্বি স্যার"
আমি খুব অস্বস্তিবোধ করতাম স্যার আমার সাথে বসে আছে বলে। যেখানে পরীক্ষায় স্যার সামনে এসে দাঁড়ালেই ভয়ে আমাদের লেখা বন্ধ হয়ে যায়! সেখানে স্যার এভাবে এসে বসে থাকতেন ২-৩ মিনিট। জানিনা অন্যরা কি ভাবতো। কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা জানেন কোনদিনও একটা শব্দ বা কোন পড়া আমাকে বলে দেন নাই। কোন হিন্ট বা একটু করে বলে দেয়া..কিচ্ছু না! আমার প্রতি উনার স্নেহ ভালোবাসা কখনো উনাকে অসততার দিকে নিয়ে যায় নি। যেভাবে ঝট করে এসে বসতেন সেভাবেই ঝট করে উঠে চলে যেতেন। এভাবে প্রতিটা পরীক্ষায় এমন করতেন। ক্লাসে পড়া জিজ্ঞেস করলে না পারলে আবার সবার মত বকা কিংবা পানিশমেন্ট দিতেন। উল্টো অন্যদের থেকে বেশিই দিতেন। এজন্য কত কত অভিমান হত। কোন বায়াসড বা স্বজনপ্রীতি দেখাতেন না।
রোজার সময় পড়া শেষ করে ইফতার এর ওয়াক্ত হয়ে আসলে স্যার যেতে দিতেন না। ছোলা মুড়ি পেয়াজু কিনে আনতেন। দুইজন মিলে কিংবা কখনো কখনো সঞ্জয় সাহা স্যার এসেও আমাদের সাথে যোগ দিতেন। একসাথে ইফতার করতাম। স্যার এর সাথে গল্প গুজব করতাম। কিন্তু স্কুলে গেলে স্যার আরেক রকম!
স্যার এর মাথায় কি চলে চলে শুধু উনি নিজেই জানতেন। একদিন বলে বসলেন, "তোর কাছে আমার মেয়ে বিয়ে দিব!" আমি অবাক আর লজ্জায় শেষ! তাও প্রথমে কথাটা অতটা সিরিয়াসলি নেই নাই। ভেবেছিলাম স্যার এর একটা অভ্যাস আছে মানুষকে কিছু একটা বলে অপ্রস্তুত করে দেয়ার। তাই এমন করেছেন। পরে দেখি উনি আমাকে 'জামাই' ডাকা শুরু করে দিসেন! আমি ভয়ে অস্থির কোনদিন কে শুনে ফেলে আর সারা স্কুল হাসাহাসি পড়ে যাবে! কিন্তু স্যার সবার সামনে বলতেন না। জানতেন বাকিরা শুনলে কি করবে।
জীবনে যাদের থেকে অনেক ভালোবাসা পাওয়ার কিংবা দরকার ছিলো তাদের থেকে অবহেলা পেয়েছি কিন্তু অন্য অনেক মানুষের ভালোবাসা/স্নেহ মমতা পেয়েছি যাদের কাছ থেকে কখনো আশাই করিনি। শুধু একটাই আক্ষেপ ওই ভালোবাসার মানুষগুলো দুনিয়াতে খুব কম সময়ের জন্য এসেছিলেন।
আমি নিজেকে অন্যর জেন্ডার, ধর্ম, আর্থিক অবস্থা, কালার, সেক্সুয়াল প্রেফারেন্স, কথা বলার স্টাইল এসব দিয়ে বিচার করিনা। কোনভাবেই বায়াসড না হবার চেষ্টা করি। কিন্তু একটা বিষয়ে আমি বায়াসড। সেটা হল শিক্ষক/শিক্ষিকা। আমি আমার টিচার্সদের ভালোবাসি। তাদের বিরুদ্ধে কটুকথা শুনতে পারিনা। কেউ কোন টিচারকে ঠাট্টা উপহাস কিংবা বিক্রিত অংগ-ভংগি করে হাসাহাসি করলে খুব মেজাজ খারাপ হয়।
দুনিয়ার সব শিক্ষকরা ভালো থাকুন..সেটা এই দুনিয়া হোক বা পরকালে। এই দোয়া থাকলো।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
ভয় আর ভালোবাসা -- PART 03
PART : 03 কবির চলে যাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না শামীমা ম্যাডাম। ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওই টাকাটা দিয়েছিলো কবিরের ভালো...
-
PART: 02 ফিরছে। বাস ফ্লাইওভারে উঠলে ভালো লাগে। গাড়ি দেখা যায়না তেমন। বাতাসটা মনে হয় একটু পাতলা আর ঠান্ডা। নিঃশ্বাস নিতে ভাল লাগে। জানালায়...
-
এমনিতেই একটা ব্যাক্তিগত কারনে কয়েকদিন ধরেই প্রিয় স্যার এর কথা মনে পড়ছিল। বিশেষ করে একটা ভিডিও দেখলাম অনলাইন ক্লাসে এক ছাত্র শিক্ষককে নোংরা...
-
আ জ শনিবার, ঘুম থেকে উঠেই আবিদের এটা মনে হল।প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই হন্তদন্ত হয়ে অফিস যাওয়ার অভ্যাস এখনো যায়নি। তাই চোখ মেলেই মনে হয় দেরি হ...
No comments:
Post a Comment