Thursday, May 13, 2021

ভয় আর ভালোবাসা -- PART 03

 PART : 03

 কবির চলে যাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না শামীমা ম্যাডাম। ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওই টাকাটা দিয়েছিলো কবিরের ভালোর জন্যই। সেটা ও ভুল বুঝলো। কোন দোষতো ছিলোনা। ছোট শহরের মা হারা ছেলে। একটু যত্ন আর মায়াতে ভালোবেসে ফেলেছিল। কিন্তু কখনো নিজে থেকে তো এসে বলেনি কিংবা কোন ধরনের উল্টোপাল্টা ব্যাবহার করেনি। কিন্তু কিইবা করার ছিলো? ছেলেটার সারল্য, জীবনকে সহজভাবে দেখার চেষ্টা, কষ্টের অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাবার প্রচণ্ড ইচ্ছা শক্তি, কিংবা মৃত মায়ের জন্য এত ভালোবাসা দেখে কোন না কোন ভাবে মনে হয়েছিলো ইস কেউ যদি আমাকেও এমন করে ভালোবাসতো! ইশ কেউ যদি কথা বলার সময় এরকম মুগ্ধতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো! কিভাবে ভালোবেসে ফেলেছে ম্যাডাম নিজেও টের পাননি। মনে মনে বললেন, “আমাকে মাফ করে দিও”
টয়লেটের আয়নার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আজ অনেক কাঁদবেন। আজকের পর আর না। নিজের ভাঙা সংসার আর স্বামীর হারানো বিশ্বাস কে ফিরিয়ে আনতে হবে। শফিকের জন্য না হোক, নিজের জন্য না হোক কিন্তু নিজের বাচ্চাদের জন্য হলেও করতে হবে। নিজেকে বার বার বুঝালেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। পারতেই হবে।

বাসায় ফিরে সোজা ওয়াশরুমে গেলো কবির। অপমানে গা ঝাঁ ঝাঁ করছে। ম্যাডাম কিভাবে ভাবলো কবির ওইসব ছেচড়া ছেলে যারা মানা করার পরও বার বার কল আর মেসেজ দিয়ে যায়! আর কিভাবে এতোগুলা টাকা দিয়ে বলল চলে যেতে যেন কবির টাকার জন্যই সবকিছু করেছে! কিভাবে ভাবতে পারলেন উনি। চোখ ফেটে চোখের পানি আসতে চাইছে। না কবির কাঁদবে না। ম্যাডামের জন্য ওর ভালোবাসা আর সম্মান দুটোই সত্য ছিল। কিন্তু ম্যাডামের দোষ নেই। কবির জানতো তিনি বিবাহিত এবং তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তাও নিজের ইচ্ছেয় জড়িয়েছে। কবির আয়নার সামনে দাড়িয়ে বলল, “আমার দোষ”। ম্যাডামের সুখের জন্য কবির অনেক দূর চলে যাবে। আবার সেই সেই স্নিগ্ধ সুন্দর চেহারাটা মনে ভেসে উঠলো। সেই সুন্দর সবুজ চোখ। তবে এবার পার্থক্য হল মাথার সেই ব্যান্ডেজ সহ চেহারাটা মানসপটে ভেসে উঠলো। ভয়ংকর রাগ উঠে গেলো। নাহ! ওই বেটাকে শিক্ষা দিতেই হবে। বিড়বিড় করে বলল, “শিক্ষা দিতেই হবে”। ঝট করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ফার্মেসীর দোকানে গেল। বড় ফার্মেসীগুলো দূরে। তাই বাসার সাথেই বস্তির পাশে ঘিঞ্জি মার্কা একটা বাজার আছে। ওখানে একটা ফার্মেসী আছে। সেখানে গিয়ে ম্যাডামের বাসায় দেখা নতুন ঔষধটা কিনলো। ভাগ্যিস পেয়ে গেছে। নাহলে সেই দূরের বড় মার্কেটে যাওয়া লাগতো। রাগ আর জিদ থাকতে থাকতে কাজটা করতে হবে কবিরকে। নাহলে আজ সকালে যেরকম ভেবেছিলো ওই বেটা কিছুই করবেনা আবার সেই মানসিক অবস্থায় ফিরে যাবে। ঔষধে মরুক না মরুক কিন্তু ভোগান্তি অবশ্যই হবে। ওই বেটার সেই ভোগান্তি প্রাপ্য। বাসায় এসে দেখে ঔষধের এক্সপায়েরি ডেট আর অল্প কদিন আছে। যাই হোক এখন আসল কাজটা করতে হবে। রুমমেট নেই আজকে। কোন আত্নীয়ের বাসায় গেসে। ফিরবে দুইদিন পর। ভালো হয়েছে কবিরের জন্য। রাতভর জেগে শাহবাগ থেকে কিনে আনা “নন-স্টেরোইডাল এন্টি-ইনফ্লেমেটরি” ঔষধগুলো গুড়ো করলো। তারপর ফার্মেসী থেকে কিনা আনা  ঔষদের ক্যাপ্সুলের ভেতরের উপাদানগুলো বের করে ফেলে দিয়ে তার ভেতরে ঢুকালো শাহবাগ থেকে কিনে আনা ঔষধের গুড়া। খুব ধীরে একটা একটা করে। একটা ক্যাপ্সুলে যতটুকু ঔষধ থাকে তারচেয়ে দুই-তিনগুন বেশি করে ঢুকালো। মনে মনে বলল,”মরুক ওই বেটা”। একটা ঘোরের মাঝে কাজটা করে ফেলল।

একসপ্তাহ শুধু ভেবেই গেলো কিভাবে এই ঔষধ ম্যাডামের বাসায় রেখে আসবে। কিভাবে কেউ সন্দেহ করবেনা। আবার মনে হতে লাগলো যা করছে তা আইনত কঠিন অপরাধ। আবার ভাবলো, যেখানে ম্যাডাম তার স্বামীর গায়ে হাত তোলার ব্যাপার মেনে নিয়ে সংসার করতে চান তাহলে কবিরের কি দরকার এসব কাজ করে। কিন্তু ম্যাডাম বলেছিল শফিক আমাকে বাঁচতে দিবে না! একবার যেহেতু সন্দেহ হয়েছে আর গায়ে হাত তুলেছে, তাহলে ওই লোক আবার কোন কারনে যে গায়ে হাত তুলবেনা তার গেরান্টি আছে? ঘোর দোলাচল।

ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হল। এই এক সপ্তাহ আনিকা পড়া লেখায় অনেক সাহায্য করেছে কবিরকে। সব সময় কবির পড়া বুঝিয়ে হোক বা এসাইনমেন্ট করে দেয়া হোক। কবিরই করতো। মেয়েটা সম্ভবত আঁচ করতে পেরেছে যে কবির মানসিনভাবে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সকালে শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে আনিকাসহ বাইরে দুপুরের খাবার খেলো।সেমিস্টার ব্রেক। এক মাস আর দেখা হবে না। আজ রাতেই বাসে করে বাড়িতে চলে যাবে।

বিকালে বাসায় ফিরে ব্যাগ গোছালো। ট্রলি ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রাখা ঔষধটা বের করলো। নাহ দিবে না। দিতে হলে আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে। ম্যাডামের ওইদিনে অপমানে পর আর উনার সামনে যাবার মানে হয়না। টাকার ব্যাপারটা খুব গায়ে লেগেছে কবিরের। বাড়িতে যাবার আগে ভাবলো লাবনীর জন্য কিছু শপিং করবে। এতদিন পর যাচ্ছে। গিফট পেয়ে খুশি হবে মেয়েটা। মানিব্যাগ নিয়ে দেখলো পর্যাপ্ত টাকা নাই তবে এক সাইডে ওইদিনের ম্যাডাম থেকে নেয়া টিউশনির বেতনের টাকাটা আছে। এতদিন রাগ করে ওই টাকা খরচ করেনি। কিন্তু এখন ভাবল, কে আবার ব্যাংকের বুথে যাবে টাকা তুলতে, এখান থেকেই খরচ করি। টাকা গুনে দেখে এক হাজার টাকা বেশি! কবিরের স্পষ্ট মনে আছে এই টাকা মানিব্যাগে রাখার পর আর হাত দেয়নি। খরচ করেনি। এই বেশি টাকাটা কি করবে বুঝতে পারছেনা কবির।

ঐদিনের কথা ভাবতেই আবার রাজ্যর সব অনূভুতি ফিরে এল যা এই দুই সপ্তাহ পরীক্ষার ব্যাস্ততায় চাপা দিয়ে রেখেছিল। খেয়াল করলো গায়ের টিশার্ট-টা ও ম্যাডামের উপহার দেয়া। কবিরের জন্মদিনে দিয়েছিলেন। মনের অজান্তেই নিজের গায়ে টিশার্টের উপর হাত বুলালো। মনে হল যেন শামীমা ম্যাডাম জড়িয়ে ধরে আছেন কবিরকে। পরম ভালোবাসায়। অমনি ওইদিনের ব্যালকনিতে দাড়িয়ে ম্যাডামকে জড়িয়ে ধরে থাকার ওই মূহুর্ত মনে ভেসে আসলো। কেমন জানি শীত লেগে উঠলো কবিরের। শেষবারের মত আবার ওই চোখগুলো দেখার জন্য মন কেঁদে উঠলো। ওই চোখ বার বার কবিরের মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঠিক মায়ের মত জলে ভাসা ভাসা সবুজ চোখ। ঠিক করলো টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আসবে। আসলে আরেকবার দেখার জন্যই যাচ্ছে।

****
দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে শেষবারের মত কবিরকে দেখার। বিকেলের সোনালী আলোর আভা। চা নিয়ে ব্যালকনিতে বসে আছেন শামীমা ম্যাডাম। মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত লাগছে শামীমা ম্যাডামের। সারাদিন কবিরের কথা ভাবেন। আবার স্বামীর সাথে সব কিছু স্বাভাবিক করার জন্য দরকারের চেয়েও বেশি আন্তরিক আর ভালোবাসা দেখাতে হচ্ছে। আর এদিকে বাচ্চাদের ফাইনাল পরীক্ষা। সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন। তারউপর নিজের হার্টের সমস্যা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। শফিক নিয়ে গিয়েছিলো ডাক্তারের কাছে। নতুন ঔষধ দিয়েছে। প্রথম কদিন খেয়ে আর ইচ্ছা করছেনা। আবার নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে। আগে শফিকের ইচ্ছে হলে ওকে নিয়ে বিছানায় যেত। আর ম্যাডাম মরা কিংবা জড় বস্তুর মত পড়ে থাকতেন শফিকের শরীরের নিচে। শফিক নিজের ইচ্ছেমত যা করার করে চলে যেত। কিন্তু এই সপ্তাহে শফিক দুইবার এসেছিল। প্রথমদিন শরীর ভালো লাগছেনা বলে শফিককে গায়ের উপর থেকে সরিয়ে দিলো। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে যে স্বামীর সাথে সব কিছু আগের মত স্বাভাবিক করতে পারবেনা। এই ভেবে গত রাতে শফিক আবার আসলে আগের দিনের মত সরিয়ে দিলেননা। কিন্তু পুরোটা সময় শফিকের জায়গাতে কবিরকে ভাবলেন। অনেকদিন পর দৈহিক মিলনে শামীমা ম্যাডাম নিজেকে ব্যাস্ত করলেন। শফিক খুশি হয়েছে। কিন্তু সকাল থেকে গত রাতের কথা ভেবে নিজেকে খুব ঘৃনা হচ্ছে। জানেন না কতদিন এই নাটক করা লাগবে। মনে হয় সারাজীবন। আজ কবিরকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। শেষ একবার।

শামীমা ম্যাডামের বাসায় যাবে বলে হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কবির। হাতে ওই ঔষধের কোটাটা রয়েই গেল। পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো এই ভেবে যে, বাড়ি যাবার সময় বাসের জানালা দিয়ে বাইরে কোথাও ফেলবে। এইটার আর দরকার নাই। শামীমা ম্যাডামের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দেখে দরজা খোলা। একবার ভাবলো ঘরে ঢুকে পড়বে। টাকাটা রেখে দিবে টেবিলে। কিন্তু তাহলে তো ম্যাডামের সাথে দেখা হবেনা। শেষবারের মত দেখতে ইচ্ছে করছে। কেন জানি মনে হচ্ছে আর কোনদিন দেখা হবেনা উনার সাথে। কলিং বেল বাজালো। তাও কেউ আসছেনা। দাঁড়িয়ে রইলো। পেছন থেকে স্যান্ডেলের আওয়াজ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখে উনাদের কাজের মেয়ে একটা। মেয়েটাকে দেখে ভাবলো, এই মেয়ের হাতেই টাকাটা দিয়ে দেই। কেন জানি মন মানলোনা।
তার বদলে জিগ্যেস করলো, “আয়ান কোথায়”।
আয়ান আর অবনী খালামনির বাসায় গেছে বলে জানালো মেয়েটা।
ম্যাডামের কথা জিগ্যেস করায় বলল উনি বাসায়। তখনি ম্যাডামের গলার আওয়াজ শোনা গেল।
কবির ঘরে ঢুকলো। ম্যাডামের হাতে চায়ের মগ। কবিরকে দেখে সেটা হাত থেকে পড়ে গেল! দুজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। কবির খেয়াল করলো ম্যাডামের মাথায় ব্যান্ডেজটা নাই। তবে কয়েকটা ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজ দেয়া। চোখগুলা আগের মতই ভাসা-ভাসা আর সবুজ কিন্তু একধরনের ক্লান্ত একটা ভাব। কাজের মেয়েটা দৌড়ে এসে ভাঙা কাঁচ কুড়ানো শুরু করলে দুইজনই সৎবিত ফিরে পেল।
আগে ম্যাডাম কথা বললেন, খুব আবেগ নিয়ে বললেন“ তুমি এসছো?”
বুঝতে পারলেন ওইদিনের পর এখন আর এই কথা মানাচ্ছেনা। তাড়াতাড়ি কথার সুর পালটে বললেন, “তুমি আবার কেন এসছো কবির?”
ম্যাডামের দুইবার দুইরকম কথায় বোকা হয়ে রইলো এক মুহূর্ত। জানালো ঐদিন টাকা নেয়ার সময় এক হাজার বেশি চলে এসছে।
ম্যাডাম টাকাটা নিতে সাফ মানা করে দিলেন। কবির সামনে এগিয়ে এসে উনার হাতে জোর করে ধরিয়ে দিলো এবং বলল, “আমার যতটুকু পাওনা আমি ততটুকুই নিব”। সাথে আরো যোগ করল, “আপনার থেকে বেশি নেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা”।
ম্যাডাম কবিরের খোঁচা দেয়া কথার জবাব দিলেন না। মনে মনে বললেন, “তোমার কোন আইডিয়া নাই আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি”। টাকাটা হাতে নিয়ে ভাঁজ করলেন। কবির চলে যাচ্ছিলো তখনি ওর হাত ধরে বললেন, “আমি টাকাটা নিব। তবে এক শর্তে। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও।“
কবির অবাক হয়ে গেল। বলল,”কি প্রশ্ন?”
ম্যাডাম বললেন, “তুমি কি সত্যি এই টাকাটা ফেরত দেয়ার জন্যই এসেছ?”
কবির থতমত খেয়ে গেলো। কবির যতই খোঁচা দেয়া কথা বলুক কিন্তু ম্যাডাম ঠিকই বুঝে গেছেন। কবির এক মুহূর্ত চুপ থেকে ভাবলো সত্যিটা বলে দিবে। যেহেতু আজকের পর আর দেখা হচ্ছেনা। ম্যাডামের হাত ধরা অবস্থায় বলল, “আমি আজ রাতে বাড়ি চলে যাচ্ছি তাই আপনাকে শেষবারের মত দেখতে এসছি”। মায়াময় ওই চোখ জোড়ায় স্পষ্ট দেখলো কবিরের জন্য ভালোবাসা।

হাত ধরা অবস্থা হয়ত এক মুহুর্ত হয়তো হয়নি। ঝট করে ম্যাডাম হাত ছেড়ে দিলেন। ম্যাডাম "শফিক" বলেই হাতটা এমনভাবে তুললেন যেন কাউকে থামাতে চাইছেন। কবির পাশ ফিরে দেখার আগেই প্রচণ্ড জোড়ে এক লাথি এসে কবিরকে আঘাত করলো। কবির ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বাড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ল। ঘটনার ধাক্কায় কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে এক মুহূর্ত ওভাবেই রইলো।পরের মুহূর্ত নিজেকে আবিষ্কার করলো পাঁচ ফুট এগার ইঞ্চি লম্বা, চওড়া আর পেটানো শরীরের শফিক সাহেবের হাত কবিরের গলায়। কবিরকে তুলে ওয়ালের সাথে ঠেসে ধরে আছেন। প্রচণ্ড জোরে গলায় চাপ দিয়ে ধরেছেন। ম্যাডাম চেষ্টা করছেন নিজের জামাই থেকে কবিরকে ছাড়ানোর জন্য। ব্যার্থ চেষ্টা। শফিক সাহেব কবিরের মুখের কাছে মুখ এনে হিস হিসে গলায় বললেন, “ওই ছোটলোকের বাচ্চা! তোর মা কি কুত্তার সাথে শুয়ে তোকে পয়দা করেছে”?
কবিরের সারা শরীরে আগুন ধরে গেলো ওর মাকে নিয়ে এমন নোংরা কথা শুনে। নিজের সর্বোচ দিয়ে চেষ্টা করলো শফিক সাহেব কে ঠেলে সরিয়ে দিতে। কিন্তু পারলোনা। উল্টো সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো। শফিক সাহেব অনবরত গালি দিয়ে যাচ্ছেন কবিরের মাকে জড়িয়ে। এদিকে ম্যাডাম কান্না জুড়ে দিয়ে শফিকের পায়ে ধরে বললেন যেন কবির কে ছেড়ে দেয়। আর বলতে লাগলেন, “আমার সাথে ওর কিছু নেই। আমি তোমাকেই ভালোবাসি শফিক”।
এতে কাজ হল। হাত আলগা হল। কবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনছিস? আর লজ্জা থাকলে এখানে আসবিনা ****র বাচ্চা”।
কাজের মেয়েটা রান্না ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আতংকিত চোখে তাকিয়ে আছে। কবির লজ্জা, আপমান আর ঘৃনায় মাথা নিচু করে ফেলল।তাকিয়ে দেখে ম্যাডাম নিচে বসে কাঁদছেন। কবির চায়না আর কোন কান্ড করতে। ম্যাডামকে কান্না করাতে চায়না। তবে ওর মাকে নিয়ে যা যা বলেছে তার শাস্তি দিবে ওই বেটাকে। মাথায় বুদ্ধি এলো আর সাথে সাথে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল।
নিচে বসে থাকা ম্যাডামকে যখন উনার স্বামী পাশে বসে শান্ত করার চেষ্টা করছেন তখনি কবির পকেট থেকে ওই ঔষধ বের করে আস্তে করে টেবিলে রাখলো। আর টেবিলের উপরে রাখা আগের ঔষধটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। বদলে দিলো ভালো ঔষধের সাথে খারাপ ঔষধের কৌটাটা।
ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। উনাকে নিয়ে শফিক সাহেব রুমে চলে যাচ্ছেন। যাওয়ার সময় কবিরের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালেন। কবির সেটা দেখেও না দেখার মত করে ঘর থেকে বেড়িয়ে এল। বের হতেই কারেন্ট চলে গেলো। মনে মনে বলল, “এটার শাস্তি তুই শিগ্রই পাবি!”
****

বাস রাতের এগারোটায়। এখনো অনেক সময় বাকি। এই আবাসিকে আর থাকবেনা। ভাবলো অদ্ভুত শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরবে। শেষবারের মত। এই আলো আধাঁরি রাস্তায় হাটতে ইচ্ছে করছে যেন কেউ না দেখে কবিরকে। একবার শফিক সাহেবের মুখ থেকে আসা নোংরা গালিগুলো কানে বাজছে। আরেকবার ম্যাডামের স্বামীর উদ্দস্যে বলা “আমি তোমাকেই ভালোবাসি শফিক”। কোন কথা বেশি কষ্ট দিচ্ছে কবির বুঝতে পারছেনা।
হাঁটতে হাঁটতে ওই অদ্ভুত রাস্তার মোড়ে এল। এখন আর আগের মত অদ্ভুতও লাগেনা। মনে হয় এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ তা হলনা। সব দিনের মত কুকুরগুলো ল্যাম্পপোস্টের উপরে অদৃশ্য কিছুর দিকে না তাকিয়ে কবিরের দিকে তাকিয়ে একসাথে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো! কুকুরগুলো ভয়ে একটু পেছনে সরে গিয়েও প্রাণপণে ঘেউ ঘেউ করে যেতে লাগলো যেন ওরা অস্বাভাবিক কিছু দেখছে। কুকুরগুলোর চোখে কবিরের জন্য ঘৃনা দেখতে পেল। অবাক তো হলই সাথে প্রচণ্ড ভয় লাগলো। বুঝতে পারলোনা কেন কুকুরগুলো এমন করলো আজ। দৌড়াতে লাগলো যতক্ষন না ওর বাসা এলো।

একটা ঘোরের মাঝে কয়েকটা ঘন্টা গেল। নিজেকে হেরে যাওয়া একজন মানুষ মনে হচ্ছে। ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ারের নিচে দাড়ালো। সন্ধ্যায় যা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে এখন কেমন জানি কুকুরগুলো কথা মাথায় আসছে। বার বার মনে হচ্ছে, কেন আজ ওকে দেখে এমন করলো কুকুরগুলো? ম্যাডাম, আয়ান, শফিক সাহেবের সাথে সাথে ওই কুকুরগুলোও কবিরকে ঘৃনা করে।

****
বাস সাড়ে ১১টায়। বাস কাউন্টারে যাচ্ছে রিকশায়। রাত হতেই এলাকার কুকুরগুলো টহল দেয়া শুরু করে দিয়েছে। ওদের দেখে কবিরের আবার ওই শর্টকাট রোডের কুকুরগুলোর কথা মাথায় আসলো। কি হচ্ছে এসব কবিরের সাথে। শান্তি পাচ্ছেনা মনে। কুকুরগুলোর এমন আচরন বার বার খোঁচাচ্ছে কবিরকে। বাস কাউন্টারে নামলো। বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। এখনো সেই কুকুরের ঘৃনাভরা মুখ গুলো কল্পনায় দেখতে পেলো। কাউন্টারের সামনে দিয়ে যাওয়া প্রতিটা গাড়ীর হেডলাইট গুলোকে কুকুরের চোখের মত লাগছে। ঝাপসা লাগছে সব কিছু। একটুপর বাস আসলো। উঠে গিয়ে নিজের সিটে বসলো। বাস ছেড়ে দিতেই মাথাটা সিটে্র সাথে লাগালো। তারপর ঝট করে সোজা হয়ে বসল। মনে হল মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে। এখন বুঝতে পেরেছে কেন কুকুরগুলো এমনভাবে আচরন করেছিল। কবির শফিক সাহেবকে শাস্তি দেয়ার জন্য ভুল ঔষধ রেখে এসছে। কঠিন অপরাধ। ওই লোক মারা যেতে পারে। রাগ, জেদ, অভিমান আর প্রতিশোধের নেশায় কবির কাউকে মেরে ফেলার ফাঁদ পেতে এসেছে! ওই লোক মরে কি মরে না সেটা পরের ব্যাপার। কিন্তু আজ নিজের বিবেককে মেরে ফেলেছে কবির। প্রচণ্ড অনুশোচনা হচ্ছে। খুনি মনে হচ্ছে। সেটা হয়তো কুকুরগুলো অনূভব করেতে পেরেছিল। 


কবির বাসা থেকে চলে যাবার পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো শামীমা ম্যাডাম। বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। এখনো করছে। ওর শরীর খারাপ দেখে শফিক আর চিৎকার চেঁচামেচি করেনি। কিন্তু বলেছে কাল গিয়ে দেখবে কবির এখনো এই এলাকায় আছে কিনা। থাকলে নাকি জানে মেরে ফেলবে। কবির বলেছিল আজ রাতেই বাড়ি চলে যাচ্ছে। কাল তাহলে আর কোন সমস্যা হবেনা। সন্ধ্যার ঘটনা বার বার মনে আসছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। একমাত্র তার জন্য কবির, শফিক আর পুরো পরিবার এলোমেলো হয়ে গেছে। ভালোবাসা অনেক বছর আগে শফিক আর তাকে এক করেছিল। আজ অনেক বছর পর সেই ভালোবাসাই সবাইকে আলদা করে ফেলল।

শফিক আগে ভাগেই না খেয়ে শুয়ে পড়েছে। শামীমা ম্যাডাম রুমে ঢুকেই দেখলেন রুম খুব ঠান্ডা। এসি আর ফ্যান দুটোই চলছে। কি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে শফিক যেন সন্ধ্যায় কিছুই হয়নি। যেন কিছুই করেনি। মনে পড়ল সন্ধ্যায় শফিকের পায়ে ধরে বলেছিল কতটা ভালোবাসে। মিথ্যে বলেছিল। কেমন জানি অদ্ভুত লাগলো মনের ভেতর। একবার মনে হল একটা ছুরি এনে শফিকের বুকের বাঁ পাশে বিঁধে দেয়। শান্তিতে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ুক। ঘোরের মাঝেই রান্না ঘর থেকে একটা ছুরি নিয়ে এসে ঘুমন্ত স্বামীর সামনে এসে দাড়ালেন। ডাইনিং থেকে আসা আলোয় শফিককে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বিছানার পাশের ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়ানায় ছুরি হাতে নিজেকে দেখ্লেন। চমকে উঠে হাত থেকে ছুরিটা পাপসে পড়ল। পাপসে পড়ায় তেমন আওয়াজ হলোনা। শফিক একটু নড়ে পা টা তুলে কোল বালিশে উপর রাখলো। আগে থেকেই সামান্য উপরে উঠে থাকা লুঙি ফ্যানের বাতাসে হাঁটুর অনেকটা উপরে উঠে গেল। শফিক শান্তিতে হাল্কা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। নিজেকে গালি দিলেন। কি করতে যাচ্ছিল এসব! নিজেকে আয়নায় দেখে ভয় লাগলো শামীমা ম্যাডামের। আয়না থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে শফিকের দিকে তাকা্লেন। ডান পায়ের উরু পর্যন্ত নগ্ন হয়ে আছে। হাত দুটো বাচ্চাদের মত মাথার উপরের দিকে তুলে ঘুমাচ্ছে। হালকা লোমশ বুক। লোমগুল লম্বা রেখা হয়ে নাভি পর্যন্ত নেমে গেছে। মনে আছে এই শরীরের প্রতিটা অংশ চেনা শামীমা ম্যাডামের। বিয়ের পর একসময় শফিকের এই গোসল করে বের  হওয়া টাওয়েল পেছানো অর্ধনগ্ন শরীর দেখে হাটু দূর্বল হয়ে আসতো। তলপেটে ব্যাথা করত। কত কত দিন শফিককে অফিসে যেতে দেরি করিয়ে দিয়েছে তার হিসাব নাই। আহা কোথায় হারিয়ে গেছে সেই দিন। শফিক এখনো বদলায়নি যদিও হার্টের অসুখ ধরা পড়েছে। শুধু একটু ভুড়ি বেরিয়েছে।
মনে আছে একবার কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রে গোসল করার সময় এক লোক বাজেভাবে তাকানোর কারনে শফিক ওই লোককে সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে মারতে গিয়েছিল। আজও তো তাই করেছে। কবিরকে গলা টিপে একটুর জন্য মেরেই ফেলত। এগুলোতো ভালবাসার কারনেই করেছে। নিজের বৌকে অন্যদের থেকে বাঁচাতেই করেছে। যে মানুষটা তাকে এত ভালোবাসে সে মানুষকে শামীমা আর কেন ভালোবাসেনা বুঝতে পারছেনা।
গত পাঁচ বছরে টাকা পয়সা অনেক বেড়েছে কিন্তু ভালোবাসা কেন কমে গেল? সব থাকার পরও কেন দিন রাত একা একা লাগতো? এইসব প্রশ্ন ভেবে নিজেকে আরো বেশি অপরাধী মনে হতে লাগলো। নিজেকে খারাপ মানুষ মনে হতে লাগলো। মনে মনে বললেন, “আজ থেকে আমাকে সব ঠিক করতে হবে”। ডাইনিং রুমে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলেন। কবিরের মোবাইল নম্বরসহ সোশাল মিডিয়া থেকে, ভাইবার থেকে ব্লক করে দিলেন। মোবাইলটা টেবিলে আবার রাখতে গিয়ে দেখলেন কদিন আগে ডাক্তারের দেয়া নতুন ঔষধের কৌটা। কদিন খেয়ে আর খাননি। মনে পড়লো কবির এই কৌটা হাতে নিয়ে বলেছিল এটা শফিকের কিনা। খুব মেজাজ খারাপ হল নিজের উপর। এত কিছুর পরও কেনো কবিরের কথা ভাবছে! যেহেতু ঠিক করেছে আজকে থেকেই সব ঠিক করবে তাই কৌটা খুলে একটা ঔষধ বের করলেন। মনে মনে ভাবলেন, “নাহ আজকে একটাতে হবেনা"।
সব সমস্যা এই হার্টের যে কোন কারন ছাড়াই আগের মত স্বামীকে ভালোবাসতে পারছেনা”। আর তিনটা ঔষধ নিলেন।


কবির কি করবে এখন বুঝতে পারছে না। তারউপর বাসে দুইজন লোক সিট নিয়ে কি একটা ঝামেলা হয়েছে সেটা নিয়ে কঠিন তর্ক করছে। ভাবতে ভাবতে ঠিক করলো ম্যাডামকে মেসেজ দিয়ে বলবে ঐ ঔষধ শফিক সাহেবকে না দিতে। মেসেজ সেন্ট হলনা। মোবাইল বা ভাইবার কোনটাতে না। একটু পর আবার দিলো। সেন্ট হলোনা। ঠিক করলো কল দিবে। কল ও গেলো না। মাথা কাজ করছেনা কি হল। একটু পর বুঝতে পারলো ম্যাডাম উনাকে ব্লক করে দিয়েছে। না চাইলেও ভাবতে কষ্ট লাগলো। ওই লোক দুটোর তর্ক এখন প্রায় হাতাহাতিতে রুপ নিচ্ছে। বাসের গাইড এসে মিমাংসা করে দেয়ার চেষ্টা করছে। বাসে তর্ক করা লোক দুটোকে পেরিয়ে সামনে গিয়ে ডাইভারকে বলল বাস থামান। ড্রাইভার সাফ মানা করে দিয়ে বলল এটা লোকাল বাস না যে যেখানে সেখানে থামাবে। এদিকে শেষ কাউন্টার পার হয়ে চলে গেছে। কবির আসল কারনটা ড্রাইভারকে বলতেও পারছেনা। এদিকে বাস ড্রাইভার বাসের ভেতরে ঝগড়া দেখে চরম মেজাজ খারাপ করে আছে। একটু পর পর গালি দিচ্ছে। তারপরও ড্রাইভারকে বলল বাসায় ঔষধ রেখে এসছে। তাই নেমে যাবে। এই কথা শুনে ড্রাইভার দাঁত্মুখ খিঁচে গালি দিতে নিয়েও দিলোনা। কিন্তু ধমকের সুরে বলল গন্তব্যে পৌছানোর পর আরেকটা কিনে নিতে কারন ঔষুধের দোকানের অভাব নাই দেশে। কবির কয়েকবার বলায় ড্রাইভারের চোখে সন্দেহ দেখতে পেল। ড্রাইভার কবিরকে চুপচাপ সিটে গিয়ে বসতে বলল। কবির ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মারপিটের আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকালো। দেখলো ঝগড়া করা একজন আরেকজনের গলা চেপে ধরে আছে আর জঘন্য সব গালি দিচ্ছে। কবিরের সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে গেলো।
****

ঔষধ খেয়ে এসে নিজের স্বামীর দিকে তাকালেন শামীমা ম্যাডাম। আগের মতই ঘুমাচ্ছে। বুকের ধড়ফড় কমছেই না। কাল আবার যাবে নাহয় ডাক্তারের কাছে। কেমন জানি ঘোর ঘোর লাগছে। ভাবলেন শফিকের কাছাকাছি শুলে হয়ত ভালো লাগবে। কোল বালিশটা সরিয়ে আসতে করে শফিক সাহেবের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। পুরনো দিনের কথা ভেবে পা একটা উনার গায়ে তুলে দিলেন। এভাবেই তো ঘুমাতেন ৫ বছর আগে যখন সব ঠিক ছিলো।

বাসেই ওই দুইজনের গলা চেপে ধরা দেখে মনের অজান্তে নিজের গলায় হাত চলে গেল। কেমন জানি দাগ হয়ে গেছে গলায়। ড্রাইভার নিশ্চয়ই সেটা দেখে কবিরকে এমন সন্দেহের চোখের তাকিয়েছে। সিটে গিয়ে আরো কয়েকবার কল দিলো। খুব ক্লান্ত লাগছে। গা ভেঙ্গে আসছে। শিশু পার্কে বাচ্চারা যেমন স্লাইডারে পিচ্ছলে নিচের দিকে নামে, কবিরের মনে হচ্ছে সে অনবরত নিচের দিকে নেমেই যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। থামছেনা। মনে হয় জ্বর গায়ে। বাসের জানলা দিয়ে আসা বাতাসে চোখ লেগে এলো। স্বপ্নে দেখলো ওই কুকুরগুলো কবিরকে তাড়া করছে।

২৫ দিন পর…
লাবনী সহ বসে কাঁচা মরিচ দিয়ে টক আমের ভর্তা খাচ্ছে। ছোটমা বলেছেন টক খেলে নাকি মুখের রুচি ফিরে আসে। ঢাকা থেকে ফেরার সময় প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বাস থেকে নেমেছে। কিভাবে নিজের বাড়ি গেছে বলতেই পারেনি। টাইফয়েড জ্বর। দুই সপ্তাহ রুমেই কাটিয়েছে। কয়েকদিন হল অনেকটা ভাল লাগছে কিন্তু কিছুই খেতে ইচ্ছা করেনা।
অসুস্থতার জন্য ঢাকায় যা যা হয়েছে সেগুলো নিয়ে ভাবার মানসিক শক্তি পায়নি। হয়তো কিছুই হয়নি। হলে তো ম্যাডাম কল করতেন। উনি নিজের মুখে বলেছেন যে কবিরকে না শফিক সাহেবকেই ভালোবাসেন।তাই  হয়তো কবিরকে জীবন থেকে ব্লক করে দিয়ে স্বামী নিয়ে ভাল আছেন। থাকুক। অনেক ভালো থাকুক যেভাবে আছেন।

অসুস্থতার পুরোটা সময় আনিকা খোঁজ খবর নিয়েছে। নতুন বাসা ঠিক করতে সাহায্য করেছে। কবিরের হয়ে নতুন সেমিস্টারের কোর্স রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে। তবে তারচেয়ে বেশি দুঃচিন্তা আর দৌড়াদৌড়ি করেছেন কবিরের বাবা। কবির সব খেয়াল করেছে। আগের মত বাবার প্রতি রাগ নেই। গত মাসে ঢাকাতে যা হল সেই ঘটনায় কবির ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে কাছের মানুষ কে আর ভালোবাসি বলে পর করে দেয় কে। ভেবেছিলো  আর ঢাকা যাবেনা। কিন্তু পরে ঠিক করলো যাবে। এই পরিবারের হাল ধরার জন্য না হোক অন্তত এই বোনের দায়িত্য নেয়ার কথা ভেবেই কবিরকে ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে হবে। ভাল চাকরি করতে হবে।

ঢাকায় গিয়ে নতুন ক্লাসে গেল। সেমিস্টার ফি জমা দিল। আনিকা সহ ইউনিভার্সিটি ক্যান্টিনে একসাথে দুপুরের খাবার খেলো। আনিকাকে রিকশায় তুলে বিদায় জানিয়ে সামনে তাকাতেই দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ওই পাশে। কবির ঠিক কি বলবে বুঝতে পারছেনা। টিউশনি ছেড়ে দেয়ার আগে থেকেই আয়ান কবিরের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলতোনা। নিজের মায়ের সাথে কবিরকে এমনভাবে দেখেছে যে স্বাভাবিক ব্যাবহার আশা করাই ভুল। এইসব ভাবছে আর যাবার জন্য পা বাড়াতেই ছেলেটা দৌড়ে এসে কবিরকে জড়িয়ে ধরলো। বয়োসন্ধিতে পড়েছে ছেলেটা। লম্বায় কবিরের সমান প্রায়। জড়িয়ে ধরেই কান্না করা শুরু করলো। কবির থতমত খেয়ে গেলো। মানুষজন দেখছে। কবির ওকে একটু দূরে নিয়ে গেলো। কি হয়েছে কাঁদছে কেন জিজ্ঞাস করায় যা বলল সেটার জন্য কবির প্রস্তুত ছিলোনা।

“পাপা আমার মাম্মিকে মেরে ফেলেছে। হি মার্ডারড হার”!

মেরে ফেলেছে মানে? বার বার এই প্রশ্ন করতে লাগলো যেন কি বলেছে বুঝতে পারেনি।

“মাম্মি নাই মাম্মি নাই। আমার কারনে মাম্মি মারা গেসে”

কবিরের হঠাত মাথা ঘুরিয়ে উঠে বমি বমি লাগতে শুরু হল। সব শূন্য লাগছে। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছেনা যে ম্যাডাম আর নেই! কান্নার আওয়াজ না এসে জান্তব একটা আওয়াজ বের হতে লাগলো। আয়ানকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে একটা গাছ ধরে কোন রকম দাঁড়িয়ে রইলো। এভাবে কতক্ষন গেলো জানেনা। আয়ান কবিরের কাছে এসে হাতটা ধরে বলল, “স্যার আমি জানি মাম্মি আপনাকে অনেক ভালোবাসতো। আমি দেখেছি সিঁড়িতে আপনাদের। একদিন বাবার সন্দেহ হলে কাজের মেয়েদের জিগ্যেস করেন। ওদেরকে অনেক বকা দিলে আমি ভয় পেয়ে পাপাকে বলে দেই আপনাদের ব্যাপারে। পাপা ঐদিন মাম্মিকে অনেক বকা আর মার দিয়েছিলো। সেদিন মাম্মিকে অনেক হেট করেছি। আপনাকেও খুব হেট করেছি কারন ভাবতাম আপনার জন্য এমন হয়েছে। কিন্তু মাম্মির মাথায় কাটা দেখে ভয় পেলে মাম্মি বলেছিলো, তোমার পাপা যে অনেক ভালোবাসে সেজন্য এমন কেটেছে। এরপর আরো একদিন মেরেছে। পরে ভাবলাম ভালোবাসলে মারবে কেন?। আপনিও মাম্মিকে ভালোবেসেছিলেন কিন্তু আপনি তো মাম্মিকে মারেন নি।“

কবিরের সব এলমেলো লাগছে। মাথায় হাজারটা কথা ঘুরছে। কোথায় ভেবেছিলো
ম্যাডাম সুখে আছে স্বামী নিয়ে। এখন আয়ান বলছে ম্যাডামকে নাকি শফিক সাহেব মেরে ফেলেছে! নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধি মনে হচ্ছে। কোন রকমে জিগ্যেস করলো কখন হয়েছে এই ঘটনা। জিগ্যেস করায় সামনে যে উত্তর আসবে সেটা যদি জানতো তবে কবির জিজ্ঞ্যেসই করতোনা।

আয়ান বলল, “কাজের মেয়ের কাছে শুনেছি আপনি আরো একদিন এসেছিলেন। সেদিনই মেরে ফেলা হয়েছে আমার মাম্মিকে। আমি খালা মনির বাসায় ছিলাম। ঐদিন নাকি পাপা আপনাকে অনেক মেরেছে। তারপর নাকি আর কিছুই হয়নি। কিন্তু আমি নিশ্চিত পাপা রাতের বেলা মাম্মিকে মেরে ফেলেছে”।
কবির তাকিয়ে আছে। মাথায় ঘুরছে ম্যাডামেই ওই মেসেজটা। শফিক আমাকে বাঁচতে দিবেনা। আয়ান আরো বলে গেল, “কিন্তু জানেন পাপা সবাইকে মিথ্যে বলেছে। আমাদের সবাইকে বলেছে মাম্মি নাকি ঘুমের মাঝেই মারা গেছে। আবার বলল এক্সপায়েরি ডেট চলে যাওয়া ঔষধ খাবার কারনেই নাকি মারা গেসে”।

এক্সপায়েরি ডেট চলে যাওয়া ঔষধ কথাটা শুনে বুকে ধক করে উঠলো কবিরের। আবার জিগ্যেস করলো আয়ানকে যেন শুনতে পায়নি। “কোন ঔষধ”।
আয়ান বলল, “মাম্মিকে ডাক্তার আগের ঔষধ চেঞ্জ করে দিয়ে নতুন একটা ঔষধ দিয়েছিল। কি জানি নামটা…”। আয়ান মনে করার চেষ্টা করছে।

কবির আতংকিত চোখে তাকিয়ে আছে আয়ানের দিকে। মনে মনে দোয়া করছে যেন সেই ঔষধটা না হয় যেটা সে ম্যাডামের বাসায় টেবিলের উপর রেখে এসছে। মনে পড়ছে সেদিনের কথা যেদিন ওই ঔষধের কৌটায় খারাপ ঔষধ ঢোকানোর পর খেয়াল করেছিল যে এক্সপায়েরি ডেট প্রায় শেষ। কবিরের আতঙ্ক বাস্তবে পরিণত হল! আয়ান ঠিক সেই ঔষধের নামই বলল যেটা কবির খারাপ দিয়ে পালটে এসছে। কবিরের বিশ্বাস হলোনা প্রথমে। বলল, “সেটা তো তোমার পাপার ঔষধ”! আয়ান তাকিয়ে রইলো এই ভেবে যে কবির কিভাবে জানে এইটা পাপা নাকি মাম্মির ঔষধ। আর কার ঔষধের চেয়ে আসল ব্যাপার হল পাপা মেরে ফেলেছে মাম্মিকে। ঔষধের ব্যাপারটা তো পাপার বানানো কথা। আয়ান কিছু বুঝতে পারছেনা কেন কবির ঔষদের কথা জিগ্যেস করলো। বলল, “না এটা মাম্মির ঔষধ। ডাক্তার নতুন দিয়েছিলো”।

মাথায় ঝড় বইছে। মনে পড়লো কবিরের। ঐদিন যখন ম্যাডামকে জিগ্যেস করেছিল এই ঔষধ শফিক সাহেবের কিনা তখন উনি কিছুই বলেন নি। কবির ধরেই নিয়েছিলো এটা শফিক সাহেবের ঔষধ। সেই মুহূর্তে মাথায় ছিলোনা ম্যাডাম জন্মগত ভাবেই ডেক্সটোকার্ডিয়া রোগী। ভাঙা মন আর প্রতিশোধের নেশায় এই সাধারন জিনিসটা মনে ছিলোনা। শফিক সাহেবকে শাস্তি দিতে গিয়ে আজ ভালোবাসার মানুষটার মৃত্যু হয়েছে আর কবির যেন জীবিত হয়েও মরে গেছে।

একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে বসে পড়লো কবির। নিজের উপর রাগ, অপরাধবোধের যন্ত্রণা আর প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট একসাথে একই সময়ে হলে কেমন লাগে সেটা কবিরই শুধু বুঝতে পারলো। আয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে স্যার মাম্মিকে কতটা ভালোবাসতো। আয়ানের চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। ভাবছে পাপাকে ওই সিঁড়ির ঘটনা বলে দেয়া উচিত হয়নি। না বললে আজ মাম্মি বেঁচে থাকতো।

আয়ান কবিরের কাছে গিয়ে বসলো। বলল, “আমি সবাইকে বলছি কেউ আমার কথা বিশ্বাস করেনি। শুধু আপনি করেছেন। আমি পুলিশ ডাকতে বলেছি। কিন্তু পাপা আর খালামনিরা ডাকেনি। মাম্মির মাথায় কাটা দাগ দেখলে যে পুলিশ সন্দেহ করবে সেজন্য।“
কবির আয়ানের মুখের দিকে নিঃশব্দ চেয়ে রইলো।
“আই হেট দ্যাট ম্যান”। সুস্পষ্ট শব্দে বলল আয়ান। সাফ জানিয়ে দিলো সে আর তার বাবার মুখ দেখবেনা। আরো জানালো সে এখন থেকে খালামনির কাছেই থাকবে।

কতক্ষন ওভাবে ঘাসের উপর বসেছিলো জানেনা কবির। শফিক সাহেবের জন্য খুব খারাপ লাগছে। নিজের বৌ হারিয়েছেন। আর এখন ছেলেও উনাকে ঘৃণা করে। এলোমেলো গন্তব্যহীন হাঁটছে। আয়ান হাত ধরে আছে। কবির নিজের হাতের দিকে তাকালো। এই হাত দিয়েই সেই ঔষধ বানিয়েছিল। ঐ বাসায় রেখে এসেছিল। আজ সেই হাত আয়ান ধরে আছে। আয়ানকে কিভাবে বলবে এই সত্যিটা? থেমে ছেলেটার মুখের দিকে তাকালো। আয়ানও তাকিয়ে আছে। হালকা গোঁফের রেখা নাকের নিচে। আয়ানের মাঝে নিজেকে দেখলো। ঠিক ওর বয়সেই তো মাকে হারিয়েছিল। ঠিক এই বয়স থেকেই তো বাবাকে ঘৃণা করে এসেছিলো কবির। খুব মায়া হল ছেলেটার জন্য। সামনে কবিরের মত কঠিন সব দিন অপেক্ষা করছে ছেলেটার জন্য। জড়িয়ে ধরে স্নেহ করতে গিয়ে আবার নিজেকে আঁটকে ফেলল। ভাবছে না জানি কবিরের জন্য আয়ানেরও কোন সমস্যা হয়! কবিরই তো দায়ী সবকিছুর জন্য। এই মা হারা ছোট ছেলেটার সামনে ভয় আর ভালোবাসা একসাথে অনুভব করলো।


Monday, May 10, 2021

ভয় আর ভালোবাসা -- PART 02

 PART: 02


ফিরছে। বাস ফ্লাইওভারে উঠলে ভালো লাগে। গাড়ি দেখা যায়না তেমন। বাতাসটা মনে হয় একটু পাতলা আর ঠান্ডা। নিঃশ্বাস নিতে ভাল লাগে। জানালায় কনুই দিয়ে ভর দিয়ে মাথাটা হাতের উপর রাখলো। আনিকার সাথে সময় ভালো কাটে। কিছুটা সময়ের জন্য হলেও ম্যাডামের কথা মাথা থেকে দূর হয়। ভাবছে সামনে থেকেও তাই করবে। রাতে বাসায় ফিরে মনযোগ দিয়ে এসাইনমেন্ট করলো। ভালোই লাগলো পড়তে বসে। অনেকদিন মনোযোগ দিয়ে পড়ে না। মজা পেল এসাইনমেন্ট করতে গিয়ে। ঔষধ যেমন জীবন বাঁচায় তেমনি কিছু ঔষধ অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহনে মৃত্যুও নিয়ে আসে। নিজের জীবনের সাথে মিল খুঁজে পেল কবির। ঔষধের মত অতিরিক্ত মায়াও ভালো নয়। সব শেষ করে দেয়।

পরদিন কবির পড়াতে গেলো। দরজা খুললো কাজের মেয়ে। সবসময়ের মত ম্যাডাম না। কতক্ষন পর নাস্তা এলো কাজের মেয়ের হাতে। সবসময়ের মত ম্যাডাম না। কবির কিছু বলল না। আরো কতক্ষন পড়িয়ে বেরিয়ে পড়লো। দরজা লাগালো কাজের মেয়ে।
এভাবে এক সপ্তাহ গেল। ম্যাডামের দেখা নাই। উনি কবিরের সামনে আসেন না। এই এক সপ্তাহ কবির হাজারবার ভেবেছে ম্যাডামকে ভাইবারে নক দিবে। বার বার উনাকে দেখতে ইচ্ছে হয়েছে। আয়ানকে ম্যাডামের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছে। কিন্তু করেনি। ভেবেছে ম্যাডাম দূরে থাকলেই ভালো দুইজনের জন্যই। উনি স্বামীর দিকে মনযোগ দিক। আর কবির পড়াশোনায়। এতে দুই পক্ষই ভালো থাকবে। আগামী মাসের শুরুর দিকে কবিরের সেমিস্টার ফাইনাল। এরপর সেমিস্টার ব্রেক। ওইদিনের সিঁড়ির ঘটনাটার পর ঠিক করেছে কবির আর এই টিউশনিটা করবেনা। আর ম্যাডামের সাথে দেখা হবেনা ভাবতেই কলিজাটা প্রচণ্ড ব্যাথা করলো! এক সপ্তাহ দেখা না হতেই এত কষ্ট, তাহলে সামনে কিভাবে থাকবে! না পারতেই হবে কবিরকে। নিজেকে বোঝালো। মোবাইলটা নিয়ে শফিক সাহেবকে কল দিল। ম্যাডামের কাছে শুনেছে শফিক সাহেব নাকি খুব রাগী। মেজাজ হারালে কি করেন আর বলে ঠিক থাকেনা। আবার মন ভালো থাকলে খুব ভালো ব্যাবহার সবার সাথে। কবিরের সাথে যে অল্প কবার কথা হয়েছে প্রতিবারই খুব হাসিখুশি আর প্রাণচঞ্চল ছিলেন। কিন্তু আজ কেমন জানি খুব গুরুগম্ভীর শোনালো। মনে হয়ে অসুস্থ দেখে। তাও কবিরের কাছে ঠিক লাগলো না। মন কেন জানি বলছে অন্যকোন কাহিনী আছে। কবির জানালো সে আগামী মাস থেকে আর পড়াবেনা আয়ান আর অবনীকে। এইটা শুনে শফিক সাহেব কল রিসিভ করে যেরকম গম্ভীর গলায় “হ্যালো” বলেছিলেন তার চেয়ে আরো গম্ভীর গলায় “ওকে” বলে কল কেটে দিলেন। কেন বা কি কারনে ছেড়ে দিচ্ছে সেটা পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করলেন না। ব্যাপারটা কেন জানি ঠিক লাগলোনা কবিরের।


পরদিন ছোট্মার সাথে ফোনে কথা বলছে। কবে বাড়িতে আসবে জানতে চাইলেন। আরো বললেন লাবণী কতটা উতলা হয়েছে ভাইকে দেখার জন্য। জানালো আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে সেমিস্টার ফাইনাল। ছোটমা কে কথা দিলো এবার ফাইনাল শেষ হলে ওইদিনই রাতের বাসে বাড়ি চলে আসবে। গতবারের মত টিউশনীর কারনে ঢাকা রয়ে যাবে না। ভালো লাগলো এইভেবে যে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করছে। কেউ তাকে দেখতে চায়। আর এইদিকে শামীমা ম্যাডাম এক সপ্তাহে একবার সামনে আসেনি। দেখা করেনি, কথা বলেনি। এসব ভাবছে আর ছোটমার কথা শুনছে। এর মধ্যেই শামীমা ম্যাডামের কল। কি আজব টেলিপ্যাথি! একটা ইম্পর্ট্যান্ট কল এসছে বলে মাকে কল কেটে দিতে বলে তাড়াতাড়ি ম্যাডামের কল ধরলো। যাক এতদিনে আমার কথা মনে পড়ল উনার। খুশি হয়েই ফোন ধরে হ্যালো বললো। ওপাশ থেকেও তাই আশা করেছিল। কিন্তু উনি কবিবের হ্যালো শেষ হবার আগেই বললেন,
“তোমার কি মাথা পুরো গেছে?”। কবির থতমত খেয়ে কোনরকমে বলল, “জ্বি বুঝলাম না”।
ম্যাডাম বললেন, “তুমি বাসায় আসো। তোমার সাথে দরকারী কথা আছে”।
কবির বুঝলো কি ব্যাপারে কথা বলতে চাইছে। এখন সেটা নিয়ে ফোনে কথা বলা যাবে না কারন উনার মাথা গরম। যদিও এখন বিকেল তবু ঠিক করল বাসায়ই যাবে কারন আজকে এমনিতেই পড়াতে যাবার কথা। বলল, “আমি এখন আসছি”।

ম্যাডামের বাসায় যেতেই উনি দরজা খুললে কবির দেখলো ম্যাডামের কপালের ডানপাশে ব্যান্ডেজ লাগালো। বাম গালের নিচে লালছে কালো দাগ। কবির কিছু বলার আগেই ইশারায় বললেন গেস্ট রুমের সাথে লাগোয়া ব্যালকনিতে যেতে। কবির ইতস্তত বোধ করলেও চলে গেল। ম্যাডামের পেছন পেছন আসলো। কবির ঢুকতেই দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বললেন,
“তুমি শফিককে কি বলেছ?”, “তুমি না মেয়ে নিয়ে মজা করে বেড়াচ্ছো কিন্তু আমি সমাধান তো করছিলামই। তুমি কেন ওকে কল দিয়ে উলটা পালটা কথা বললে?”
কবির কোন প্রশ্নর উত্তর দিবে বুঝে উঠলোনা।
বলল, “আমি টিউশনি ছেড়ে দিচ্ছি সেটাই উনাকে বললাম”।
ম্যাডাম ওর কথা শেষ হবার আগেই বললেন, “আমাদের ব্যাপারে শফিককে কি বলেছ? ও জানলো কিভাবে ওই ব্যাপারটা?”
কবির ম্যাডামের মুখে আঘাতের দাগ আর ব্যান্ডেজের কারন কিছুটা আঁচ করতে পারলো।
বলল, “আমি শুধু মাত্র টিউশনি না করার কথাই বলেছি। অন্য কিছু না”।
কবির আরো বলল, “আমি এমন কিছু কেন বলব যাতে আপনার সমস্যা হয়। আমি আমার চরম ক্ষতি করে হলেও আপনাকে রক্ষা করবো কারন আপনি আমার খুব কাছের। ভালোবাসার মানুষের জন্য আমি খুনও করতে পারি”। এসব বলতে গিয়ে গলা ধরে এল কবিরের।
ম্যাডাম অপলক চেয়ে আছেন কবিরের দিকে। রাগ চলে গিয়ে ম্যাডামের ওই সবুজ চোখে পানি জমা শুরু করেছে। কবির বুঝতে পারলো আজকে প্রথম নিজের ভালোবাসার কথাটা জাহির করে ফেলেছে। চোখ সরিয়ে নিল ম্যাডামের দিক থেকে। চায়না ম্যাডাম কবিরের চোখের পানি দেখুক।
ম্যাডাম এগিয়ে এসে কবিরকে জড়িয়ে ধরলেন। কবিরও তাই করলো। এতদিনের চেপে রাখা অনূভুতি আর গত এক সপ্তাহ না দেখার কষ্ট। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রন করতে পারলো না। সব মিলিয়ে  নিজের অজান্তেই চুম্বনের অংক মিলিয়ে ফেলল। ওইদিনের অন্ধকার সিঁড়ির মত কবির হতবিহ্বল হয়ে রইলো না। চুম্বনের ঘোরে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো।



কতক্ষন সময় এমন ছিলো জানে না কবির। আস্তে করে দুইজন অপরজন থেকে সড়ে দাড়ালো। কবির বুঝতে পারছেনা কি বলবে।
ম্যাডামই আগে কথা বললেন, “শফিক সিঁড়ির ওই ব্যাপারটা জেনে গেছে। কাজের মেয়ে গুলো মনে হয় দেখে ফেলেছিল। শফিক সম্ভবত ওদের কাছ থেকে শুনেছে”।
যদিও সেদিন আধো আলো ছায়ায় কবিরের মনে হয়েছে আয়ানের অবয়ব দেখেছে। ম্যাডামকে এই কথাটা বলল না।
কবিরের ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে ম্যাডাম বললেন, “ যেদিন শফিকের হার্টের অসুখের ল্যাব রিপোর্ট আসলো সেদিন প্রচণ্ড অপরাধবোধ হচ্ছিল। রাতে তাহাজ্জুদের নামাযে আল্লাহর কাছে কেঁদে কেটে দোয়া করছিলাম শফিকের জন্য। মাফ চাইছিলাম আল্লাহর কাছে আমার অপরাধের জন্য। হয়তো একটু জোরে জোরের বলছিলাম। শফিক শুনে ফেলে। আমি রুমে আসতেই বলে কি অপরাধের জন্য তুমি ক্ষমা চাইছো আর কান্না করছো? আমি কথা ঘুরানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু শফিকের সন্দেহ হয়”।
কবির চুপ করে শুনে যাচ্ছে। কিছুই বলছেনা। সামনে কি ঝামেলা আসছে ভেবে চিন্তা হচ্ছে।
ম্যাডাম বলে চললেন, “পরদিন সকাল থেকে শফিক বাসায়। আমিই যেতে দিই নি। বিকালে সুপারশপে গেলাম বাজার করতে। ঘন্টা দুয়েক পর বাসায় এসে দেখি কাজের মেয়ে একটা কাঁদছে। আয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কিছু বলল না। অবনী বলল বাবা বকা দিয়েছে ওকে”।
রুধশ্বাসে কবির বলল, “তারপর?”
ম্যাডাম মুখের ব্যান্ডেজ দেখিয়ে বললেন, “তারপর হল এই। শফিকের বদ মেজাজের স্বভাব আছে কিন্তু ও এর আগে কখনো আমার গায়ে হাত তোলেনি। সম্ভবত কাজের মেয়েটাকে তোমার আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলো। নিশ্চয়ই শফিকের রাগের সামনে পড়ে সব বলে দিয়েছে। আমারও ওই মেয়েকে কিছু জিজ্ঞাসা করার ইচ্ছে হয়নি। শফিক রাগে দুঃখে আমার গলা চেঁপে ধরে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। ধাক্কা দেয়াতে ওয়ালে মাথা লেগে ব্যাথায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম”।
এইটুকু বলে ম্যাডাম কবিরের দিকে ভালো করে তাকিয়ে বললেন, “কি ভাবছো?”
কবির বলল, “আমার জন্য তোমার, ইয়ে মানে আপনার এত বড় সমস্যা হয়ে গেল”।
কবিরের হাতটা ধরে ম্যাডাম বললেন, “তোমার দোষ নেই কবির। আমিই ভালোবাসার পাগল। আমি ভালবাসার মানুষের জন্যই বাঁচি। তাদের ভালোলাগা-মন্দ লাগা, তাদের ঘিরেই আমার জীবন। এক কথায় শফিক আর বাচ্চারা আমার পৃথিবী। কিন্তু শফিককে আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। ওর দিন রাত কাজ আর কাজ। ছুটে চলা এক শহর থেকে আরেক শহর। ফোন করে বাচ্চাদের খোঁজ নেয় কিন্তু আমি কেমন আছি জিগ্যেসও করেনা । বাইরে থেকে এসে দেখে বাচ্চারা ঘুম। আর সকালে বাচ্চারা ওকে ঘুমে রেখে স্কুলে চলে যায়। আর সেক্স লাইফ? সেটারো সময় নেই। রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় আসে। আমার উপরে উঠে নিজের ইচ্ছে মত যা করার করে। তারপর ধপাস করে নিজের বালিশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। একবার জিগ্যেসও করেনা আমার কেমন দিন গেল। আয়ান তো বড় হচ্ছে। এখন মার সাথে তেমন কথাই বলে না। আজকাল তো একদমই না। আর অবনী ওর পড়ালেখা নিয়ে নিজের মত থাকে। যাদের নিয়ে আমি আমার পৃথিবী বানিয়েছি তারাই আমাকে বাদ দিয়ে ওদের আলাদা আলাদা পৃথিবী বানিয়ে নিয়েছে। এই সবের মাঝে তুমি এসেছিলে আমার এই খালি পৃথিবীতে। প্রথমদিন তুমি কেমন আগ্রহ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিলে। এমনভাবে যেন খুব সুন্দর কিছু দেখছো। ওইদিনের কথা বার বার মনে পড়ে। ওভাবে আমার দিকে অনেকদিন কেউ তাকায়নি। ঘরের আর আট দশটা ফার্নিচার হয়ে গিয়েছিলাম সবার চোখে। তোমাকে দেখে আমি অনুপ্রেরনা আর শক্তিই দুটোই পেতাম কারন তুমি কত সহজে নিজের প্রিয় বোন, পরিবার আর বাড়ি থেকে এসেছ এই শহরে মনের শান্তির জন্য। আর আমি আমার প্রিয় মানুষের ছেড়ে কোথাও চলেও যেতে পারিনা তোমার মত।
ম্যাডামের কথা গুলো কবিরকে ছুঁয়ে গেল। কখন যে চোখের পানি গড়িয়ে পড়া শুরু হয়েছে টের পায়নি। এই মানুষটাকে ছেড়ে কবির কিভাবে দূরে যাবে?
দুইজন দুইজনের হাত ধরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। রুম থেকে কিসের যেন আওয়াজে সৎবিত ফিরে পেল। তাকিয়ে দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। ঝট করে হাত ছেড়ে দিল কবির।

সেদিন টিউশনিটা কোন রকম শেষ করল। আয়ান আগের মত কথা বলে না। চুপচাপ থাকে। আর অবনী তো পড়া যা দেয় তাই পড়ে। একবার বুঝালে বুঝেও যায়। আরেকবার বলা লাগেনা। মেয়েটার মাথায় কি চলে কে জানে। কেন এমন অদ্ভুত এই মেয়ে ভাবে কবির। বিশেষ করে ম্যাডামের সাথে কথা বলার পর থেকে ভাবছে কিভাবে আজকাল কার বাচ্চারা মা থেকেও আলাদা হয়ে যায়। কত দ্রুত! আর কবির এখনো নিজের হারানো মায়ের কথা ভেবে কাঁদে।

বাসায় গিয়ে কোনরকমে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারছে না। কাল কত সুন্দর পড়া লেখা করল। আর আজ ম্যাডামের বাসায় নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ করে দিয়ে এসে অদ্ভুত লাগছে। একদিকে হালকা লাগছে বলে দিয়ে। আরেকদিকে আতঙ্কিতবোদ করছে কারন শফিক সাহেব জেনে গিয়ে ম্যাডামের গায়ে হাত তুলেছেন। জানেনা আজ কি হচ্ছে। তবে কবির এইটা জানে সব ভালোবাসার পরিনতি হয়না। একজনের প্রতি আরেকজনের ভালোবাসাটাই শুধু মিল। আর কিছুই মিলে না। এটা কেউ মেনে নিবেনা। না পরিবার না সমাজ। এটা ভাবতেই পড়াশোনার সব ইচ্ছে মিটে গেলো। কবিরের একবার মনে হয় বাড়ি চলে যাই। আরেকবার ভাবে ম্যাডাম কি করছে কি জানে।

রাতে বুয়ার রান্না করা মাছ দিয়ে ভাত কটা জোর করে গিলল। জঘন্য স্বাদ। আর বাড়িতে বাজারের টাটকা ছোট্মাছ দিয়ে নিমিষেই দুই প্লেট ভাত খেয়ে ফেলতে পারতো কবির। শুয়ে মাত্র তন্দ্রা মত এসছে। তখনই ভাইবারের ম্যাসেজ নটিফিকেশনে সেটা ভেঙ্গে গেল। ম্যাডাম নাকি আনিকা? আনিকা। এসাইনমেন্টটা কাল স্পাইরাল বান্ডিং করতে যাবে একসাথে। সেটা জানানোর জন্য মেসেজ। কবির বিরক্ত হয়ে রেখে দিল। একটু পর আবার নটিফিকেশনের আওয়াজ এলো। আবার ওই মেয়ে নিশ্চই কোন অকাজের কথাই লিখেছে। কিন্তু কেন জানি শান্তি পাচ্ছেনা। আবার মোবাইল খুলে দেখে ম্যাডামের মেসেজ! লেখাটা এমন,
“শফিক আমাকে বাঁচতে দিবেনা। আজ যা করলো। এতোটা বাজে ব্যাবহার করবে আমি ভাবতে পারিনি। জানো আমি কোনদিন বাবা-মায়ের মার খাইনি।ঠিকই করেছে। আসলে আমি এটারই যোগ্য। তুমি টিউশনি ছেড়ে দিয়ে ঠিক করেছ। আমি ওকে বুঝিয়েছি যা ছিলো সব আমার পক্ষ থেকে। তোমার কোন দোষ নেই। আমি চাই না আমার কারনে তোমার কোন ক্ষতি হোক। অনেক দূরে থেকে হলেও আমার ভালোবাসাটা যত্ন করে রেখো। আর এই সব মেসেজ ডিলিট করে দিও। আমিও ডিলিট করে দিয়েছি।“

মেসেজটা পড়ে কবিরের কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠলো। রাগে মুখ আর কান গরম হয়ে গেলো। নাহ এভাবে আর চলবে না। ওর জন্য ম্যাডাম এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ম্যাডামের মত একটা সুন্দর মানুষের গায়ে হাত তুললো ওই লোক! একটা শিক্ষা দিতেই হবে। ভাবতে ভাবতে মাথায় বুদ্ধি এলো। তাড়াতাড়ি উঠে লাইট জালালো রুমের। রুমমেটে গালি দিয়ে উঠলেও সেটার পরওয়া করলোনা। ম্যাডাম কদিন আগেই বলল ওই বেটার হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। নিশ্চয়ই হার্টের ঔষধ খাচ্ছে। এখন হার্টের ঔষধের সাথে যদি “নন-স্টেরোইডাল এন্টি-ইনফ্লেমেটরি ঔষধ” যেমন “ডিক্লোফেনাক” বা “নাপ্রোক্সেন” বেশি মাত্রায় খাইয়ে দেয়া হয় তবে কদিনের মধ্যে হার্ট-এটাক করে মরবে। মানুষ ভাববে হার্টের ব্লকের জন্যই মারা গেছে। এগুলো সব কদিন আগের করা এসাইনমেন্ট করতে গিয়ে শিখেছে। কিন্তু কিভাবে দিবে। আর ঔষধ গুলা কোথায় পাবে? ভাবতে ভাবতে মনে পড়ল হাবিব স্যারের কথা। উনি বলছিলেন কিভাবে শাহবাগের ঔষধের দোকান গুলোতে প্রেস্ক্রিপশন ছাড়াই যেকোন দেশি বিদেশী ঔষধ পাওয়া যায়। কিন্তু আরো কিছু ব্যাপার রয়েছে। ওই ঔষধ শফিক সাহেব কে কিভাবে খাওয়াবে। উনি নিশ্চই রেগুলার ঔষধের বাইরে কোন ঔষধ দেখলে সন্দেহ করে বসবেন। আরো ভাবতে ভাবতে একটা হলিউডের ছবির কথা মনে পড়ে গেল যেখানে এক লোক তার বউকে ডাক্তারের ব্যাবস্থাপত্রে দেয়া সাধারন ক্যাপ্সুলের মাঝে অন্য ঔষধের উপরকণ ঢুকিয়ে দিয়ে মেরে ফেলেছিল। মানে ডাক্তারের দেয়া ভালো ঔষধের ক্যাপ্সুলের খোলসে খারাপ ঔষধ ঢুকিয়ে দিয়েছিলো। ওই মহিলার হার্টের অসুখ ছিলো বলে কেউ সন্দেহ করেনি। খুব খুশি হল কবির। “শফিক এবার বুঝবি কাউকে মারার মজা” বিড়বিড় করে বলল। সন্তুষ্ট হয়ে লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। কাল শাহবাগ যাবে ওই ঔষধগুলো কিনতে। আনিকাকে মেসেজ দিয়ে রাখলো যে সে কাল স্পাইরাল বাইন্ডিং করতে যাবেনা।


সকালে তাড়াতাড়ি উঠে রেডী হল। ভাইবার গিয়ে দেখে আনিকার শুধুমাত্র একটা এংগ্রি ইমোজি দিয়ে ওর আগের রাতের মেসেজের জবাব দিয়েছে। রাগুক। এখন কবিরের এসব ভাবার সময় নেই। ওই বেটাকে শিক্ষা দেয়া না পর্যন্ত কবিরের শান্তি নেই। শাহবাগের অলি-গলি খুঁজে ওই সব স্পেশাল ঔষধগুলো বের করছে। মাঝে ছোট্মা ভিডিও কল দিয়েছিল। লাবনী নাকি দেখতে চেয়েছে ভাইকে। কবির কল কেটে দিয়েছে। এই ঝামেলাটুকু যাক। তারপর আসবে কবির। প্রাণ ভরে দেখবে তখন। রাতে রুমমেট ঘুমিয়ে গেলে ঔষধগুলো ট্রলী ব্যাগে লুকিয়ে রাখলো যেন রুমমেট দেখে সন্দেহ না করে।

পরদিন ক্লাসে পুরাটা সময় আনমনা ছিল। আগেরদিন আনিকার সাথে বাইরে যায়নি বলে মেয়েটা আজকেও রেগে আছে। আজ ক্লাসে ঢুকেই সব সময়ের মত আনিকার পাশে না বসে কোনার সিটে গিয়ে বসে পড়ল। আনিকা দেখে অবাক হয়েছে। কবিরের সেদিকে মনযোগ নেই। কিভাবে ওই শফিক বেটাকে ঔষধগুলো খাওয়াবে সেটাই ভাবছে। ক্লাস শেষে লাইব্রেরীতে গিয়েও তাই ভাবলো। হার্টের ব্লকের জন্য কি ঔষধ দেয় সেটা বের করার চেষ্টা করলো। কিন্তু বাংলাদেশে ঔষধ বিক্রি হয় ব্রান্ডের নামে। তাই একই উপাদানের অনেক কোম্পানি ঔষধ বানায়। এখন শফিক সাহেব কে ডাক্তার কোনটা দিয়েছে সেটা তো কবির জানে না। নাহ! এভাবে হবে না। হতাশ হয়ে লাইব্রেরীতে বসে রইলো। আনিকা দূর থেকে কবিরকে দেখছে। কিছু একটা ঝামেলা হচ্ছে সেটা বুঝতে পারলো।

সন্ধ্যায় পড়াতে গেল। ম্যাডামের দেখা নাই। একবার ভাবলো আয়ানকে জিগ্যেস করবে। কিন্তু ওইদিন ব্যালকনিতে ম্যাডামের হাত ধরা অবস্থায় আয়ান ওকে দেখে ফেলেছে। আবার ওইদিন অন্ধকার সিঁড়িতে ম্যাডাম হুট করে কবিরকে কিস করে ফেলার দিনও আয়ানকে আবছা আলোয় দেখেছে বলে কবিরের মনে হয়। যদিও পুরোপুরি নিশ্চিত না। তাই আর ওদের জিগ্যেস না করার সিদ্ধান্ত নিলো। যাওয়ার সময় ওদের কাজের মেয়ে একটা কে জিগ্যেস করলে বলল ডাক্তারের কাছে গেসে। রাগ লাগছে কবিরের। জানা গেলোনা ওই বেটা কি ঔষুধ খাচ্ছে। অবশ্য ম্যাডাম থাকলেও কবির হয়তো জানতে পারতো না শফিক সাহেব কি ঔষুধ খাচ্ছেন। কিন্তু ওই বেটাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য যে কবির ঔষধ দিচ্ছে সেটা উনাকেও বলতে পারবে না। আর বললেও ম্যাডাম এটা কখনোই করবে না। কবির জানে ম্যাডাম নিজের চেয়ে কাছের মানুষদের বেশি ভালোবাসেন।


বাসায় ফিরছে হেঁটে হেঁটে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে। ভেবে কোন হাল পাচ্ছেনা কিভাবে ওই শফিক বেটাকে ঔষধ গুলো খাওয়াবে যেন ঐ লোক আর ম্যাডাম কেউই না জানতেই পারে।  খুব হতাশ লাগছে। মাঝে কদিন সেই ভূতুরে অদ্ভুত শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরেনি। আজ ভাবলো যাবে। আজকেও সেই একই ঘটনা। কুকুরগুলো ল্যাম্পপোস্টের দিকে তাকিয়ে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। কবিরের সেদিকে মনযোগ নেই।


মনকে যতই বুঝাক তাও বার বার ম্যাডামের কথাই ভাবা শুরু হয়ে যাচ্ছে আনমনে। কেমন আছে,কি করছে তাই ভাবে। নিশ্চই স্বামীর মারের আঘাতের কারনেই ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন। মনে মনে জঘন্য গালি দিল ওই বেটাকে আর ভাবলো মেরে আবার ডাক্তার দেখানো হচ্ছে! ভাইবারে মেসেজ দিলো ম্যাডামের মানা শর্তেও। একটু পর পর এপ এ ঢুকে দেখছে ম্যাডাম মেসেজ দেখেছে কিনা সেটাই দেখতে। না। কবিরের ম্যাসেজের কোন উত্তর আসেনা। পড়াশোনা লাটে উঠেছে। খুব ছোট্ট কারনে বুয়ার সাথে খারাপ ব্যবহার করলো। লাইট জ্বালিয়ে রাখা নিয়ে রুমমেটের সাথে ঝগড়া করে বলেই বসলো সে বাসা ছেড়ে দিবে। আনিকার সাথেও আর যোগাযোগ করেনি। ছোট্মার কলও ধরেনি। ভাবছে এই একটা ব্যাপার নিয়ে ভেবে ভেবে একে একে সবার মন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। একটা ঘোরের মাঝে রাতটা পার করলো। দিনে আরো কয়েকটা মেসেজ দিয়েছিলো। ঔষধের ব্যাপারে কবিরের প্ল্যান নিয়ে ম্যাডামকে জানিয়ে মেসেজ লিখে সেন্ট না করেই আবার ডিলিট করে দিলো। হতাশার আরেকটা দিন গেলো।

এরপরদিন কবির টিউশনিতে যাচ্ছে হেঁটে হেঁটে। যেতে যেতে ভাবছে  শফিক সাহেবকে শিক্ষা দেয়ার প্ল্যান বাদ। কবির নিজেই অনেক দূরে চলে যাবে। যেখানে ম্যাডামের কোন ইচ্ছে নেই কবিরের সাথে থাকার তাহলে কবিরের এসব করার দরকার নাই। আর এইটা যদি কোনভাবে ম্যাডাম জেনে যান তবে কবির উনার কাছে ঘৃনার পাত্রই হবে। থাক। কবিরের কারনেই সব সমস্যা। এইতো আর এই সপ্তাহটা বাকী।
পড়াতে পড়াতে আধা ঘন্টার মত হয়েছে। এমন সময় ম্যাডাম রুমে আসলেন। কবির ভেবেছিলো ম্যাডাম আর সামনেই আসবেনা। দেখলো উনার ঠোঁটের দিকে কাটা দাগ আর পুরো মাথায় ব্যান্ডেজ পেঁচানো। কবির সেটা দেখে ভয়ংকর রাগ উঠে গেলো। ও কিছু বলার আগেই বললেন,
“আয়ান-অবনী, আজ তোমাদের স্যারের পড়ানোর শেষ দিন। ওর ফাইনাল পরীক্ষা তো সেজন্য।”

 ওরা কিছুই বলল না। তাকিয়ে রইলো। অবনী শুধু মাথা নাড়ালো এমনভাবে, যেমন করে মাথা নাড়ে যখন কবির কোন পড়া বুঝিয়ে দেয়ার পর জিজ্ঞ্যেস করে বুঝতে পেরেছে কিনা।

কবির বুঝে উঠতে পারেনা কি বলবে। তাও বলে উঠলো “ম্যাডাম…”।
কবির কথা শেষ করার আগেই বললেন, “ কবির আজকে ওদের তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দাও। আর যাবার আগে একটু কথা বলে যেও।”

 কবির মনে মনে ভাবলো আজ সব কথাই বলে যাবে। আজ তো কথা বলতেই হবে। মাথায় অনেক কিছু ঘুরছে। তাও আয়ান আর অবনীকে ওদের পড়া ঘুছিয়ে দিল। আয়ানকে দেখে বুঝা যাচ্ছে ছেলেটা কবিরের উপর রেগে আছে। এটা অবশ্য ওইদিনের অন্ধকারের সিঁড়ির ঘটনার পরেরদিন থেকেই কবির সেটা বুঝতে পেরেছে। আর আয়ানও বোকা নয়। যা হচ্ছে ঘরে তা বুঝার ক্ষমতা ওর আছে। বুঝতে পারছে কোননা কোন ভাবে কবির দায়ী।
পড়ানো শেষ করে চেয়ার থেকে উঠে দাড়িয়েছে তখনি ম্যাডাম রুমে এসে বললেন, “তোমরা তোমাদের রুমে যাও। মা তোমাদের স্যারের সাথে কথা বলি”।
ওরা চলে যেতেই ম্যাডাম কবিরের হাতে টাকা ভর্তি খাম ধরিয়ে দিয়ে হড়বড় করে বললেন,
“এই তোমার বেতন। আর কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবে না। এখানে তোমার বেতনের চেয়েও অনেক বেশি টাকা আছে। এই এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও বাসা নাও। আমি চাইনা তুমি আমার পরিবারের কাছে আসো“।

পায়ের নিচে মাটি সরে যাওয়া কিংবা মাথায় আকশ ভেঙ্গে পড়া। এই কথা গুলো কবির বইয়ে অনেক পড়েছে কিন্তু আজ সত্যি সত্যি অনূভব করলো। প্রচন্ড রাগ আর অভিমান চেঁপে বসলো। কি বলবে বুজতে না পেরে জোরে হেঁসে উঠলো! ম্যাডাম অবাক হয়ে একবার কবিরের দিকে তাকায় আরেকবার দরজার দিকে। ভাবছে কেউ কবিরের হাসি শুনতে পেয়েছে কিনা।
হাসি থামিয়ে কবির বলল, “তো ভালোবাসা শেষ?” বলেই আবার হাঁসা শুরু করলো কবির।
আবার হাঁসি থামিয়ে বলল, “আপনার জন্য কত সহজ তাই না? একদিন এত ভালোবাসা যে অন্ধকারে চুমু খেয়ে বসেন আর আরেকদিন কিছু নাই?”।

শামীমা ম্যাডাম দরজার দিকে আরেকবার তাকিয়ে বলেন, “তুমি মনে কর আমার জন্য এটা সহজ? তুমি শফিককে চেনো না। এইযে দেখছো আমার গায়ে আঘাতের দাগ এগুলো এত বছরের সংসারে প্রথমবার ঘটেছে আমার সাথে”।
কবিরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বললেন, “তুমি কোন প্রভাবশালী পরিবারের ছেলে না। তোমাকে ক্ষতি করা শফিকের জন্য কোন ব্যাপার না”।

কবির বলল, “তো এখন আমাকে আপনার প্রভাবশালী স্বামীর ভয় দেখাচ্ছেন?”
ম্যাডাম বললেন, “না আমি এতদিন ওর থেকে তোমাকে বাঁচিয়ে এসছি। এখনো তাই করার চেষ্টা করছি। আমি সবকিছুর দায়ভার আমার কাঁধেই নিয়েছি। ওকে হাতে পায়ে ধরে বুঝিয়েছি যেন তোমাকে কোন ক্ষতি না করে। তুমি দূরে চলে গিয়ে ভালো থাকো।“

কবির বলল,”দূরেই যদি চলে যেতে বলার ছিল তবে শুরু থেকে এত এত মায়া আর ভালোবাসা দিয়ে কাছে টানার কি দরকার ছিলো?”
কবির খাম থেকে ওর যতটুকু বেতন সেটা নিয়ে বাকি টাকা ম্যাডামের হাতে দিয়ে বলল, “পৃথিবীতে যদি কেউ সবচেয়ে বেশি আনন্দ আর ভালোবাসা পা্বার হকদার হয় তবে সেটা আপনি।“

রুম থেকে বেরিয়ে ডাইনিং এ আসলো। টেবিলে খাবার দিয়ে সাজানো নাস্তার ট্রে। বোধহয় কবিরকে দেবার জন্যই রেডি করেছিল। প্রথমদিনের কথা মনে পড়ে গেলো। ট্রে থেকে পানির গ্লাস নিয়ে পানি খেতে গিয়ে দেখলো ঔষধের বক্সে রাখা নতুন ঔষধের কৌটা। নামটা দেখলো। তাচ্ছিল্য করে বলল, “আপনার প্রানপ্রিয় স্বামীর?”
যদিও এটা শামীমা ম্যাডামের ঔষধ। বলতে গিয়েও বললেন না। চাইছেন না কথা বাড়াতে। কবিরের এইসব অদ্ভুত ব্যাবহারে শুধু অবাক হচ্ছেন। কবির চলে যাক চিরতরে। নাহলে শফিক খুনই করে ফেলবে এই ছেলে কে।
চলে যাবার আগে ম্যাডামের মাথার ব্যান্ডেজের দিকে তাকিয়ে শুধু বলল, “শফিক সাহেব যা করেছেন ঠিক করেননি। আপনার গায়ে হাত তুলে চরম ভুল করেছেন"


Wednesday, May 5, 2021

ভয় আর ভালোবাসা -- PART 01

PART: 1

বিদ্যুৎ নাই তাই লিফট কাজ করছে না। সিড়িও অন্ধকার। দুই এক মিনিটের মাঝেই বিল্ডিং এর জেনারেটর চালু হয়ে যায়। প্রায়ই কবির টিউশনি শেষে বের হবার সময়ই কারেন্টটা যেতে হয়। আজব ব্যাপারশামীমা ম্যাডাম তিন তলা থেকে মোবাইলের টর্চ লাইট ধরে আছেন। উনি অপেক্ষা করতে বলেছিলেন জেনারেটর আসার আগ পর্যন্ত কিন্তু কবির "লাগবেনা" বলে দ্রুত নেমে গেল। গত সপ্তাহে যা হয়েছে কবির চায়না তা আবার হোক। উনার এক ছেলে আর এক মেয়ে। দুইজনকে পড়ায়। ছেলেটা ক্লাস এইটে, ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্র। আর মেয়েটা ক্লাস ফাইভে, বাংলা মিডিয়ামে। কবির সপ্তাহে দিন সন্ধ্যায় পড়াতে আসে। দুইজনকে পড়িয়ে ওই বাসা থেকে বের হতে হতে রাত প্রায় সাড়ে ১০টা বেজে যায়। তার উপর শামীমা ম্যাডাম এর বাহারী ধরনের নাস্তা নিয়ে আসেন একটু পর পর। সেগুলা খেতে আর উনার সাথে টুকটাক কথা বলতে বলতে এত সময় চলে যায় যে বাসায় ফিরে ওর নিজেরই পড়ার সময় থাকেনা।

কারেন্ট না থাকলে রাস্তার সবগুলো ল্যাম্পপোস্টে লাইট জ্বলে না। কিছু জ্বলে কিছু জ্বলে না। যদিও এই আবাসিক এলাকাটা খুব নামকরা। ছিমছাম। গোছানো সুন্দর। আবাসিকের ভেতর ঢুকলে মনেই হয়না এটা ঢাকা। একারনে সবাই একনামে চিনে। এরকম একটা আবাসিকে এই অবস্থা ভাবা যায়! একদিক দিয়ে ভালোই লাগে এই আধো আলো আধো ছায়ায় হেঁটে বাসায় যেতে। আর টাকারও ব্যাপার আছে। ছোট শহর থেকে উঠে আসা উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। থাকে মেসে। বন্ধুদের সাথে শেয়ারে। তাই টাকা পয়সা হিসেব করেই চলতে হয়। নামকরা এক প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ে কবির। সাব্জেক্ট ফার্মাসী। টিউশন ফী অনেক বেশি। তার বন্ধুদের কেউ টিউশনি করে না। বড়লোকের ছেলে-মেয়ে ওরা। ওদের টিউশনির দরকার নাই।  

রাতের এই সময় রাস্তায় খুব বেশি গাড়ি থাকেনা কিছুক্ষন হাঁটতে হাঁটতে মোবাইলটা বের করল কবির। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে নিল। সামনে একটা শর্টকাট রাস্তা আসছে যেটা দিয়ে এফ ব্লক থেকে সি ব্লকে চলে আসা যায়। শুনশান রাস্তা। মোড় ঘুরলেই শর্টকাট রাস্তাটা আসবে। মোড়ের দুই প্লট আগেই এই রাস্তার শেষ বিল্ডিংটা। এরপর দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা খালি দুটো প্লট। এখনও মালিক বিল্ডিং নামের জঞ্জাল দাড়া করায়নি। খালি প্লটে নানা রকম ঘাস জন্মে আছে। অল্প জমা পানিতে মশা, ব্যাঙ্ আর নাম না জানা পোকার বাসস্থান। মানুষ আসার আগ পর্যন্ত এটাই ওদের বাড়ি। শেষ বিল্ডিং এর সামনের ল্যাম্পপোস্টটা কারেন্ট না থাকলে জ্বলে না। কিন্তু মোড়ের কাছে খালি প্লটের সামনের ল্যাম্পপোস্টটা মিটিমিটি জ্বলে কারেন্ট থাকুক বা না থাকুক। যে ল্যাম্প পোষ্টটা জ্বলার দরকার ছিল সেটাই জ্বলে না! আজব ব্যাপার স্যাপার। শেষ বিল্ডিংটা পার করছে। সামনে কুকুরের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। বিল্ডিং এর সামনের বাল্বে্র আলোয় যতটুকু আলো হবার ততটুকু আলো হয়ে আছে। আস্তে আস্তে আলো কমে আসছে। মোড়ের ল্যাম্পপোস্টের আলো নামে মাত্র। তারউপর ল্যাম্পপোস্টে গায়ে লতানো গাছ পেঁছিয়ে আলো আরো কমিয়ে দিয়েছে। কবির মোবাইলটা শক্ত করে ধরল। ঢোক গিলে নিল। ডান দিকে মোড় ঘুরলো। দেখলো আর সব দিনের মতই পাঁচ ছয়টা কুকুর ওই ল্যাম্পপোস্টের ঠিক গোড়ায় দাঁড়িয়ে উপরের দিকে মুখ করে প্রানপনে ঘেউ ঘেউ করেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ওরা ল্যাম্পপোস্টের উপর কিছু একটা দেখছে! কি জানি অদৃশ্য কিছুর দিকে তাকিয়ে কুকুরগুলো এমন করছে কে জানে। কুকুরগুলোর শারীরিক ভাষা দেখে মনে হচ্ছে ওরা ভয়ে আছে কিন্তু জায়গা ছেড়ে যেতে রাজী না। ছোট শহর থেকে আসার কারনে কবির গ্রামের অন্ধকার রাস্তায় হেঁটেছে। তাই কুকুর আর অন্ধকার রাস্তায় ভয় নেই। তবুও শহরে এরকম একটা আবাসিকে এমন রাস্তা আসবে কবির কল্পনা করেনি। কেমন জানি অদ্ভুত অনুভূতি হয় এখানটায় আসলে। যতই নিজেকে মানা করে তবুও কুকুরের চাহনী লক্ষ্য করে উপরে দিকে চোখ চলেই যায় কবিরের। না কিছুই নেই সেখানে। তবুও মগজ নানা রকম ভয়ংকর কিছুর আকার আকৃতি বানাতে চায়। সেকারনে জোর করে মোবাইলে মনোযোগ দিয়ে হেঁটে মোড়টা ঘুরে শর্টকাট রাস্তাটা পার হয়ে যায়। কুকুর মানুষের ভয় অনূভব করতে পারে। ওদের অনুভুতি শক্তি অনেক বেশি। তাই জোরে হাঁটা থেকে নিজেকে দমিয়ে রাখে তবুও হাঁটার দ্রুততা বেড়েই যায়। কুকুরগুলোর কবিরের দিকে মনযোগ দেবার কোন আগ্রহ নেই। ওরা একতালে আগের মতই উপরের দিকে তাকিয়ে ডেকেই যাচ্ছে। এটা যদি প্রথমবার হত তাও কথা ছিল। যখন থেকে এই রাস্তা আবিস্কার করেছে তখন থেকেই দেখে আসছে। প্রথমদিন মেসে ফিরে রাতে কুকুরগুলকে স্বপ্নে দেখেছিল। এরপর আর দেখেনি। তাও ওই রাস্তা দিয়ে ফেরার সময় একইরকম অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় কবিরের। তারপরও কেন জানি ওই রাস্তা দিয়েই মেসে ফিরে।



মেসে ঢুকতেই ভাইবার এপ এর মেসেজ নোটিফিকেশন। মেসে ওয়াই-ফাই আছে। নেট পেয়েই নটিফিকেশন দিল ভাইবার। ইচ্ছে করছেনা দেখতে কারন জানে কে মেসেজ দিয়েছে। শামীমা ম্যাডাম। বাসায় পৌছে গেছে কিনা কবির তাই জিজ্ঞাসা করে মেসেজ। সিন না করেই রেখে দিলো। গত এক সপ্তাহ ধরে কবির তাই করছে। উপেক্ষা। টিউশনী ছেড়ে দেবার চিন্তা করেছে। এই মাসটা যাক। তারপর সে মুক্ত।

এবার সেলুলার কলের আওয়াজ। "উফফ" বলে আবার মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখে মোবাইল ডিসপ্লে তে লেখা "ছোট মা" হ্যাঁ ছোট মা। নিজের আসল মা না। কবিরের বয়স যখন ১৪ বছর তখন ওর মা মারা গিয়েছিলেন আরেকটা বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়ে। মা আর বাচ্চা কেউ বাঁচেনি। ১৩ বছরে বয়োসন্ধিকালে পড়ে ১৪ বছরের কিশোর মন এত টুকু জানে বাচ্চা কিভাবে হয়। মায়ের মৃত্যুর জন্য বাবাকে দায়ী করে এসেছে কবির। কি দরকার ছিলো আরেকটা বাচ্চা নেবার! তা না হলে আজ ওর মা বেঁচে থাকতো। বছর পর যখন কবিরের বাবা ওর ছোট খালাকে বিয়ে করে নিয়ে আসলো তখন থেকেই কবির প্রচন্ড ঘৃনা করে এসেছে বাবাকে। বছরও অপেক্ষা করতে পারলো না। আরো বাচ্চা বানানোর মেশিন নিয়ে এসছে!! এই ছিল কবিরের রাগ আর আক্ষেপ। খালামনিকে যেন ছোট মা ডাকে সেটা সবাই শিখিয়ে দিলো। তাও কবির তার বাবা আর উনার নতুন বউকে কিছুই ডাকেনা। এই না ডাকা বা সম্মধন না করার ব্যাপারটা কবিরের বাবা প্রথম দিকে মেনে নিলেও পরে আর মানতে পারলেন না। ওকে গালাগালি, বকা-ঝকা, এবং মেরেও চেষ্টা করা হয়েছিল। কিছুতেই কবির মেনে নেয়নি বাবার নতুন বিয়ে। ওর পরিবার বলতে শুধু মাত্র ওর বছর বয়সী বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ছোট বোন "লাবনী" আর কাউকে আপন মনে করেনা। দাদী আর নানীকে আরো বিষ লাগে কারন উনারাই কবিরের বাবার দ্বিতীয় বিয়ের মূল ঘটক। বয়স বাড়তে বাড়তে সবার সাথে এত বেশি দূরত্ব হল যে কবির চাইতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে। আত্নীয়-স্বজন সবাইকে অসহ্য লাগতো। অনেকবার বাড়ির বাইরে চলেও গিয়েছিল। কিন্তু বোনের কথা ভেবে বার বার ফিরে এসেছে। ছাড়া যে কবিরের আপন কেউ নাই এই দুনিয়া তে। আর না দেখলে কে দেখবে এই প্রতিবন্ধী মেয়েটাকে। ওদেরই এলাকার এক প্রতিবন্ধী মেয়ের ধর্ষনের খবর শুনে কবির এতটা ভয় পেয়েছিল যে ঠিক করেছে বাড়ীতে থাকবে। এখানকার ডিগ্রি কলেজেই পড়বে। এই পরিবার আর নতুন সংসারকে না চাইতেও আপন করে নিতে হবে। এইসব নিজেকে অনেক বুঝিয়েছিল। 

এভাবে দুই বছর যাবার পর একদিন খেয়াল করলো লাবনীর সাথে খালামনির অনেক ভাব। লাবনীর মাঝে মাঝে এত রাগ উঠে। কিছুই বুঝাতে পারেনা। কারো কথা শুনে না। ওর এইসব কাজ বাবার ভাষায় পাগলামী হলেও কবির জানে মেয়েটা কোন কারনে খুব কষ্ট পেয়েছে। নাহলে এমন করেনা লাবনী। এরকম করলে কবির ছাড়া কেউ লাবনীকে শান্ত করতে পারে না। অবাক হল যেদিন খালামনি লাবনীকে শান্ত করলো। কবির আগে খেয়াল করেনি কিন্তু লাবনীর সাথে খালামনির খুব সুন্দর স্বাভাবিক একটা সম্পর্ক। কত সুন্দর করে লাবনীর চুল আঁছড়ে দিচ্ছে আবার হাসছেও! কলেজ থেকে ফিরে এই দৃশ্য দেখে কবিরের মন থেকে অনেক বড় পাহাড় নেমে গেল। নাহ! যতটা খারাপ ভেবেছিল খালামনি সেরকম খারাপ না। বোনের সংসারকে সুন্দর আপন করে নিয়েছেন। নিজের কোন বাচ্চা নেন নি। এরপর থেকে একবছরে "খালামনি" থেকে "ছোট মা" হয়েছেন উনি। কিন্তু বাবার সাথে কবিরের সম্পর্ক আগের মতই তেতো রয়ে গেছে। এজন্য টাকা পয়সা থেকে শুরু করে ঢাকায় প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়া সব সিদ্ধান্তে "ছোটমা" সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। কবিরের হয়ে ওর বাবাকে বুঝিয়েছেন উনি। আর সবচেয়ে বড় কথা লাবনীকে মমতায় বড় করছেন। এই এক কারনে কবির এই জঘন্য এলাকা ছেড়ে ঢাকা চলে যাবার মত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল।

 ছোট্মার কল ধরেই আগে লাবনীর কথা জিজ্ঞাসা করলো। বাবার কোন একটা ইটভাটাতে নাকি শ্রমিকের দুইদলের মাঝে মারপিট হয়েছে। সেটা মিট্মাট করতে গিয়ে নাকি বাবাও আহত হয়েছেন। কবির জানে ছোট্মা এগুলা কেন বলেন। কবির যেন বাবাকে কল দিয়ে কথা বলে। বাবার সাথে সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা। এগুলো শুনতে ভালো লাগেনা কবিরের। কেন ওর সাথেই এমন হয়? সুন্দর স্বভাবিক সম্পর্কগুলো কেন এভাবে বিগড়ে যায়? এগুলা ভাবতে ভাবতে শামীমা ম্যাডামের কথা মনে আসলো। এদিকে ছোট্মা কথা বলেই যাচ্ছেন। সেদিকে কবিরের মনযোগ নেই। ভাবছে ম্যাডামের কথা।

প্রথম যখন শামীমা ম্যাডামের বাচ্চাদের পড়ানোর প্রস্তাবটা পায় কবির সাথে সাথে মানা করে দিয়েছিল। ইংলিশ মিডিয়ামে বাচ্চা পড়ানোর অভিজ্ঞতা নেই ওর। তার উপর সে ফার্মাসী এর স্টুডেন্ট। ইঞ্জিনিয়ারিং এর হলে একটা কথা ছিলো। কিন্তু টিউশনির টাকার অংক শুনে দ্বিতীয়বার ভাবলো। মাস শেষে খরচের টাকার জন্য বাবাকে কল দিতে হবেনা ভাবতেই রাজী হয়ে গেল। প্রথমদিন অনেক ভয় আর ইতস্ততা নিয়ে গেল। ম্যাডাম ঘরের মধ্যেই হিজাব করা। কবির আসবে দেখে মনে হয়। উজ্জ্বল শ্যামলা মায়া ভরা মুখ। উনার দিকে তাকালে প্রথমে যা নজরে আসে তা হল এক জোড়া সবুজ চোখ। হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের মত! আর চোখে মনে হয় একটু পানি জমে আছে। ঠিক যেমন কান্না আসার আগে হয় সেরকম। এই ভাসা ভাসা সবুজ চোখের কারনে মনে হয় এই অদ্ভুত মায়া। যদিও এই মায়ার আসল কারন কবির আরো অনেক পরে বুঝতে পেরেছিল। এখনো স্পষ্ট মনে আছে উনার হাতে এলোমেলোভাবে পেঁছানো মাল্টিপ্লাগ সমেত সেদিন দরজা খুলেই বলেছিলেন

"তুমিইকাবিইইর” রাইট?", 

"আমার ঘরের কাজের মেয়েগুলো কাজ না থাকলেও এত বিজি যে আমাকেই দরজা খুলতে হয়!"

 "সরি তুমি করে বলে ফেললাম কিছু মনে কোরোনা"

কবির কোন রকমে বলল, "জ্বি, কোন সমস্যা নাই"

উনি খুব মিস্টি করে হেসে ভেতরে আসতে বললেন।

উনার মুখে ওর কবির নামটা স্টাইল করে "কাবিইইর" ডাকা শুনে খুব ভাল লাগলো। এই প্রাইভেট ভার্সিটিতে যখন ভর্তি হয়েছে তখন থেকে নিজের নামটা আদিকালের নাম বলে মনে হচ্ছিল। সবার কি সুন্দর সুন্দর নাম! আর তার নাম কিনা কবির। আংকেল টাইপ নাম রেখেছে ওর বাপ। এজন্য কবিরের আরো রাগ লাগে বাপের উপর! নামটাও রেখেছে নিজের মত জঘন্য।

প্রথমদিন অনেক ভয় নিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে কথা বলল শামীমা ম্যাডামের ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেটার সাথে। নাম আয়ান। অনেক ফাঁকিবাজ এই ছেলে। বাগে আনা দায়। অনেক সময় আর কৌশল করে পড়াতে হয়। কিন্তু মেয়েটা খুব শান্ত আর পড়ুয়া। নাম অবনী। বেশি একটা সময় না দিলেও হয়। ছেলেটা রাজ্যর প্রশ্ন করে তবে সেটা পড়ালেখা নিয়ে না। নতুন গেজেট আর ফুটবল নিয়ে। তবে অবনী পড়া ছাড়া কিছু নিয়ে আগ্রহী না। ওদের বই আর সিলেবাস দেখতে দেখতে ৩০ মিনিটও হয়নি ম্যাডাম নাস্তা নিয়ে হাজির। তিন রকমের ঝাল নাস্তা নিয়ে আসলেন। কবির জীবনে এই প্রথম চিজ খেলো। এর আগে অনেক ইংরেজী ছবিতে চিজ এর নাম শুনেছে কিন্তু আজ খেলো। ঢাকায় আসার পর এই প্রথম এত ভালো ভালো খাবার খেলো কবির। এর এক ঘন্টা পর আবার নাস্তা নিয়ে আসলেন। এবার মিস্টি জাতীয় খাবার। আগের খাবার গুলো কেমন লেগেছে সেটা জিজ্ঞাসা করলেন।


কবির হড়বড় করে বলেছিল “অসাধারন…এত ভালো চিজ নুডলস আমি আগে খাই নাই!” ম্যাডাম মিষ্টি করে হাসলেন। কিন্তু আয়ান জোরে হেসে উঠে বলল,

“ভাইয়া এটা তো চিজি পাস্তা… চিজ নুডুলস না!”
কবির লজ্জা পেয়ে গেল। হাইফাই খাবারের হাইফাই নাম। কবিরের লজ্জা পাওয়া বুঝতে পেরে শামীমা ম্যাডাম বলেছিলেন,
“আরেহ সব একই জিনিস। একজন একরকম নামে ডাকে।“ উনার এই কথা শুনে কবির স্বাভাবিক হল।
কবির মিষ্টি খেতে পছন্দ করেনা কিন্তু ম্যাডাম সামনে দাড়িয়ে আছেন। ওর বাড়ি আর বাবা-মা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেন। ম্যাডাম কি মনে করবে ভেবে সৌজন্যতা করে ক্ষীরের বাটিটা থেকে এক চামচ খেলো। স্বাভাবিক মুখ করে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করল তবুও মুখ এমন করে ফেলল যে শামীমা ম্যাডাম বুঝে ফেললেন খাবারটা কবিরের ভালো লাগেনি। বললেন,
“আমি মিষ্টি খাবার এত ভালো বানাতে পারিনা। খুব বেশি খারাপ হয়েছে? রেখে দাও। সমস্যা নাই”।
আসলে ক্ষীর ঠিকই আছে তবে কবিরের মিষ্টি জিনিস একদম ভালো লাগে না। গোলাপ জলের গন্ধ একদম সহ্য হয়না।
ম্যাডামের জন্য খারাপ লাগলো কবিরের। বেচারী এত কষ্ট করে বানিয়েছেন কিন্তু দোষ নিজের ঘাড়েই নিলেন। সেদিন মেসে ফেরার সময় নিজেকে আচ্ছা মত গালি দিয়েছিল কবির। আর প্রতিজ্ঞা করেছিল এরপর থেকে নাস্তা খেয়ে খুব সুন্দর করে খাবার আর রান্নার প্রশংসা করবে।

……

ছোট মা’র সাথে কথা বলে ভেবেছিল আনিকার এসাইনমেন্টটা করা শুরু করবে। কিন্তু উনি এত এত কথা বলছেন আর কবির কানের পাশে মোবাইলটা রেখে চুপচাপ শুয়ে শুয়ে উনার কথার জবাবে হ্যা-হুম করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল।

আনিকা মেয়েটাকে ভালো লাগে কবিরের। ভালোলাগাটা ঠিক প্রেম-প্রেম কিনা সেটা কবির ঠিক বুঝতে পারেনা। অন্যদের চেয়ে আলাদা বলেই ভালো লাগে। মেয়েটা অগোছালো টাইপ। একই জামা বার বার পড়ে। সামান্য কোঁকড়ানো চুল। কোনরকম আঁচড়ে আসে। চোখের নিচে গাঢ় করে কাজল দেয়। আর মাঝে মাঝে কপালে টিপ। মেক-আপ বলতে এতটুকু। প্রাইভেট ভার্সিটির মেয়েগুলো খুব সাজুগুজু করে আসে ক্লাসে। কথা বলার সময় সামনের জন কি বলল তারচেয়ে নিজের চুল আর লুক ঠিক করতেই ব্যাস্ত থাকে। ছোট শহর থেকে আসার কারনে শুরুতে ওদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতো। পরে বুঝতে পেরেছিল বাহ্যিক সৌন্দর্যের পেছনে সময় দেয়া মানুষগুলো কতটুকু আত্নকেন্দ্রিক। আনিকা অন্য সবার চেয়ে আলাদা। প্রথম দিকে সবার সাথেই কথা বলতে ইতস্তত বোধ করত বিশেষ করে মেয়েদের সাথে। তবে কেন জানি আনিকার সাথে খুব সহজে কথা শুরু হয়ে গেলো। মনে হয় আনিকার সাধারন বেশভুষা আর সরল আচরন কবিরকে আনিকার দিকে টেনে নিয়েছিল। কথায় কথায় ওদের বন্ধুত্ব জমে উঠেছিল। আনিকা বোনের সাথেই থাকে। মাঝে মাঝে এটা সেটা রান্না করে আনে কবিরের জন্য। এজন্য কবির নিজে থেকেই আনিকার বিভিন্ন এসাইনমেন্ট আর ল্যাব রিপোর্ট করে দিতে লাগলো। আনিকার সাথে প্রায়শ ক্যাম্পাসের বাইরে ঘুরতে যেত। আর ওর কথায় ভাইবার এপটা ইন্সটল করেছে যেন সব সময় যোগাযোগ রাখতে পারে। আনিকার একটা পাগলামী আছে। ও নতুন নতুন খাবার খাওয়ার বাতিক আছে। যেই শুনে একটা রেস্টুর‍্যান্ট এ নতুন কোন ডিশ এসছে অমনি আনিকা কেও সেটা খেয়ে দেখতে হবে। ওর ইচ্ছা ইউটিউবে নিজের একটা ফূড রিভিউ চ্যানেল খোলা। একবার এক নতুন রেস্টুর‍্যান্ট এ বার্গার খেতে গেলো দুইজন। বার্গারে তেলাপোকার বাচ্চা পেল কবির। বমি করতে করতে শেষ। পরে সেদিন যখন পড়াতে গেল একটু দেরি করে তখন ম্যাডাম দেরির কারন জিজ্ঞাসা করায় বলল বার্গারে তেলাপোকা পাবার ঘটনা। সেদিন ম্যাডাম বাসায় নিজের হাতে বার্গার বানিয়ে আনলেন। অসাধারন হয়েছিল। কবির বিশ্বাস করতে পারেনি বাসায় কেউ বার্গার বানাতে পারে তাও এমন ভালো! আর ম্যাডামের এই কাজ কবিরের মনটা ছুঁয়ে গেল।

ঘুম ভাঙল খুব সকালে। গতকাল রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে। ছোট মার কথা শুনতে শুনতে কবে ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি। পানিও কম খেয়েছে। ফলাফল গ্যাস আর বুকে ব্যাথা। আগে কখনো এই সমস্যা ছিলোনা। ঢাকা আসার পর থেকেই এই সমস্যা শুরু হয়েছে। ডাক্তার দেখাতে হবে ভাবতে ভাবতে পানি খেলো। মোবাইলে কাল থেকে আসা সব নটিফিকেশন এসে জমা হয়ে আছে। সেখানে আছে আনিকা আর শামীমা ম্যাডামের মেসেজ। ঘুমিয়ে পড়ার কারনে মেসেজের জবাব দিতে পারেনি। নিজের বুকের ব্যাথা এর কথা ভাবতেই শামীমা ম্যাডামের কথা মনে পড়লো। উনারো হার্ট এর সমস্যা আছে। জন্মের পর থেকেই নাকি। একবার কবিরকে বলেছিল। সেটা ভাবতে ভাবতে উনার মেসেজ ওপেন করলো। মেসেজ ওপেন করে দেখে বিরাট বড় মেসেজ। সারসংক্ষেপ হল, উনার স্বামী শফিক সাহেবের হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে। সারাদিন নতুন ব্যাবসায় সময় দিতে দিতে শরীরের দিকে খেয়াল করেননি। ফল সরূপ এই সব বড় রোগ। কিন্তু শামীমা ম্যাডাম এইসবের জন্য নিজেকে দায়ী করছেন। উনার মনে হয় এটা উনার পাপের শাস্তি। নিজেকে দোষী ভাবছেন। কিন্তু উনি নিরুপায়।
পাপ! কবির জানেনা যা হয়েছে সেটা কি ভুল না পাপ। সকাল সকাল এসব ভাবতে চায় না। পেট খুব ব্যাথা করে উঠলে টয়লেটে গেলো। আজকাল টয়লেটে গেলেই রাজ্যর সব দার্শনিক কথা বার্তা মনে আসে। তাই ঘন্টা ঘন্টা বসে থাকে কিন্তু সময় কিভাবে যায় টের পায়না। এজন্য রুমমেট অনেক ব্যাজার থাকে কবিরের উপর। ভালোবাসার অনুভূতি ব্যাপারটা জানি কেমন অদ্ভুত। একজন মানুষ যতই শক্তিশালী হোকনা কেন, ভালোবাসার মানুষের কাছে সে দূর্বল। ভালোবাসার অনুভূতির জন্ম কখন আর কিভাবে এটা কেউ বলতে পারে না। মনের অগোচরে এসে বাসা বেঁধে ফেলে। ঠিক যেন ক্যান্সারের মত। যখন খবর হয় তখন আর কিছুই করার থাকেনা। ম্যাডামের সাথে কবিরের তাই হল। ভাঙা পরিবারের ছেলে। অনেক দিনের পুষে রাখা রাগ আর অভিমান বাবার সাথে। মা ছিলো সংসার আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধি বোনকে নিয়ে ব্যাস্ত। বাবা ব্যাবসা নিয়ে। মায়ের মৃত্যুর পর এলোমেলো সবকিছু। আত্নীয়-স্বজনেরা কেউ কবিরের অভিমান বুঝেনি। উলটো কবিরের ব্যবহারকে উনারা দোষ হিসেবে দেখেছেন কিন্তু কেন এমন করছে সেটা বুঝার দরকার মনে করেনি কেউ। ঢাকায় এসে ভেবেছিল দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবে। কিছুটা হলেও পেয়েছে। কিন্তু মনের অস্থিরতা কমেনি। একটা শুন্যতা বার বার পেয়ে বসতো। ক্লাস আর বাসা। বাসা আর ক্লাস।


মাঝে মাঝে আনিকা সহ বাইরে যায়। কিন্তু সেটা অনেক কম। কারন সব বার আনিকা খাবারের বিল দিলে খারাপ দেখা যায়। আর বড় রেস্টুরেন্টে খাবার খাওয়ার মত টাকা কবিরের নেই। তাই আনিকার সাথে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছিলো।
কবিরের শুন্যতা যেন এই টিউশনীই মিটিয়েছিল। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে শামীমা ম্যাডাম। উনার কবিরের ছোট ছোট বিষয়ে মনযোগ দেয়া,পছন্দ-অপছন্দের খেয়াল রাখা, খুটিয়ে খুটিয়ে লাবনীর বিষয়ে খোঁজ নেয়া, লাবনীর জন্য গিফট কেনা, আরো  কত কি! কবির কখনো বুঝে উঠতে পারেনি কেন শামীমা ম্যাডাম ওকে এতটা যত্ন আত্নী করেন। তবে বুঝতে পারতো উনার ব্যাবহারে। উনি কবিরের সাথে গল্প করতে ভালোবাসতেন। টিউশনীর কিছু মাস পরেই কবির খেয়াল করতো উনি প্রায় সময় কারন অকারনে এসে কবিরের সাথে কথা বলতেন। অনেক সময় নিজের ছোটবেলার কথা, মা এর সাথে রাগ করে পুরাদিন ঘরের এক কোনে লুকিয়ে থাকা যেন সবাই খুঁজে না পেয়ে চিন্তায় পড়ে যায় সেই কাহিনী, কখনো ছোটবেলার অনেক মজার কথা বলে হাসতেন আবার কখনো সাংসারিক জীবনের পাওয়া না পাওয়ার কথা বলে চোখের জ্বল ফেলতেন বিশেষ করে স্বামীর সময় না দেয়ার আর না ভালোবাসার কথা। ওই সুন্দর চোখ জোড়া হাসি হোক বা কান্না, কখনো মায়াহীন হতোনা। সৌন্দর্য হারাতোনা। প্রায় বলতেন “আমি বেশি দিন বাচবো না”। কেন জানি এই কথা কবিরকে খুব কষ্ট দিত। কবির এই কথার জবাবে বিভিন্ন রকম যুক্তি আর কথা দিয়ে, কখন কোরআন-হাদীস দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করত যেন না বলে। সময়ের সাথে সাথে উনার এই কথার জবাবে কবির রাগ করত। একবারতো হুমকি দিয়ে বলেইছিল “আপনি এই কথা আবার যদি বলেন তবে আমি আর পড়াতে আসবো না”! সেদিন উনি অনেক্ষন কবিরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। কি ভাবছিলেন কে জানে! কবির পরে নিজেও অবাক হয়েছিল নিজের এমন ব্যাবহারে। 


সেদিন প্রথম বলেছিলেন নিজের হার্ট এর অসুখের কথা। ডেক্সট্রকার্ডিয়া। সোজা কথায় উনার হার্ট আর সবার মত বুকের বাম দিকে না হয়ে ডান দিকে। এটা জন্মগত ভাবেই। শুধু তাই নয় হার্টের বিভিন্ন সহযোগী মাসলগুলো ও উল্টো। এই কারনে ছোটবেলা থেকেই অল্পতে সর্দি, মাথা ব্যাথা, সাইনাসের সমস্যা, বার বার নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। বয়সের সাথে সাথে এগুলো বাড়ছে। অন্যর জন্য এত এত মায়া করা মানুষটাকে দেখে কে বলবে এরকম একটা হার্ট নিয়ে বেঁচে আছেন। সেদিন এসব শুনে কবির অবাক হয়েছিল। ভাবতেই পারেনি এরকম কোন রোগ থাকতে পারে। অনেক কঠিন হৃদয়ের মানুষ দেখেছে আর ভবেছে এদের বুঝি কোনো হার্ট নেই। বা থাকলেও ডিফেক্টেড। কিন্তু শামীমা ম্যাডামের এরকম হবে সেটা কল্পনাতীত।

টয়লেটে আবারো এসব ভাবতে ভাবতে কখন সময় চলে গিয়েছে টের পায়নি। শুধু গ্যাস এর ঔষধ খেয়ে তাড়াহুড়ো করে রেডী হয়ে ক্লাসের জন্য বের হয়ে গেল। যেতে যেতে আনিকার মেসেজটা পড়ল। এসাইন্মেন্টটা হয়েছে কিনা তাই জিজ্ঞাসা করেছে। না করেনি। মেয়েটাকে অনেক দিন হল ঝুলিয়ে রেখেছে। নাহ আজই করবে। ম্যাডামের এসব ভাবতে ভাবতে আসলে নিজের পড়ালেখা আর মানসিক শান্তি সবকিছু নষ্ট হচ্ছে। ক্লাসে ঢূকেই আনিকার দিকে তাকিয়ে ইশারায় সরি বলল। আজকের মাঝেই করে দিবে প্রমিস করলো। মেয়েটা কপট রাগ দেখিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। তারপরও ওর পাশের চেয়ারে গিয়ে বসলো। সকাল সকাল ক্লাসের বোরিং সব পড়া। তাও নিজেকে জোর করেই মনোযোগ দেয়ালো স্যার এর লেকচারে। কারন এক, ম্যাডামের কথা মনে করতে চায় না। দুই, এই পড়াগুলো এসাইন্মেন্ট করার সময় কাজে লাগবে। ক্লাস নিচ্ছেন হাবিব স্যার। উনার ছোট ছোট চোখ দিয়ে একবার ক্লাসের দিকে আরেকবার প্রেসেন্টেশন স্লাইডের দিকে তাকাচ্ছেন আর “এন্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস” কেন ব্যাবহার করা হয়। এগুলোর উপাদান, কাজ আর ভয়ানক সাইড এফেক্ট নিয়ে বলছেন। মাত্রাতিক্ত বা ভুল ব্যাবহারে যে কি পরিমান ক্ষতি হতে পারে সেটা বলতে গিয়ে চোখ আরো ছোট ছোট হয়ে এল উনার। কয়েকজন উনার চোখের এই পরিবর্তন দেখে মুচকি হাসলো।

ক্লাস শেষ করে লাইব্রেরীতে গিয়ে বসল এসাইনমেন্ট করতে। মনে বসছেনা একদম। বার বার মনে হচ্ছে শামীমা ম্যাডামের কথা। উনার স্বামীর অসুস্থতা নিয়ে নিজেকে দোষারোপ করছেন। অনুশোচনায় পুড়ছেন। সাথে সাথে নিশ্চয়ই স্বামীর জন্যও দুশ্চিন্তা করছেন। ইচ্ছে করছে কথা বলে উনাকে শান্ত করতে। ভাবছে ওর কিছু করা উচিত। কিন্তু কি করবে কবির? নিজের উপর খুব রাগ হলো। কেন সে এত এত ভাবছে? শামীমা ম্যাডাম ছোট বাচ্চা নন। উল্টো কবির বয়সে অনেক ছোট। ম্যাডাম নিশ্চই নিজেকে শামলাতে পারবেন। কবিরের দরকার নাই। কিন্তু সেই মায়াভরা সবুজ চোখের কথা মনে আসতেই কবির বার বার মনযোগ হারাচ্ছে। মনের মাঝে এই দোলাচলে নিশ্চল হয়ে ল্যাপটপের দিকে শূন্য দৃশটিতে তাকিয়ে আছে। এর মাঝে আনিকা এলো। এসেই বলল,
“জানতাম তোমাকে এখানেই পাবো।“
কবির ওর দিকে আগের শূন্য দৃষ্টি নিয়েই তাকিয়ে রইল।
আনিকা আবার বলল, “কিরে আমাকে চিনতে পারছো না? কি হয়েছে তোমার?”
কবির কোনরকমে বলল, “কিছু না”, তোমার এসাইনমেন্টটাই করছিলাম, কাল পাবে”।
আনিকা আঁচ করলো কবিরের মন ভালো নেই। বলল, “আচ্ছা সমস্যা নাই। তুমি তোমার হিসেবেই করো“।
কবির একটু মেকি হাসলো।
কবিরের মুড ভালো করার জন্য আবার বলল, “ফাইনালি ঢাকাতে ভালো কোন সী-ফুড রেস্টুরেন্ট হয়েছে। আজকে বিকেলে চল যাই“।
কবির সরাসরি মানা করে দিল। সী ফুডের অনেক দাম।
আনিকা বলল, “আরেহ তুমি না বলেছিলে কখনো কাঁকড়া খাওনি। ওখানে কাঁকড়া নাকি খুব ভালো করে। তুমি কাঁকড়া আর আমি অক্টোপাস খাবো”, “চল যাই”!
কবির একটু ভাবলো। এমনিতেই অনেকদিন যায়না কোথাও আনিকা সহ। আর সারাক্ষন শামীমা ম্যাডামের কথা ভাবতে ভাবতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তারউপর উনিও খুব ইমোশনাল। কি না কি হয়! ওই দিনের সিড়িতে যা হয়েছে ওই রকম কিছুনা হয়ে যায় আবার! এসব ভেবে আনিকার সাথে বাইরে যেতে রাজি হয়ে গেল।

রেস্টুরেন্টের খাবার আসলেই ভালো। কাঁকড়া প্রথমে খেতে কেমন কেমন লাগছিলো কিন্তু আনিকার অক্টোপাস খাওয়া দেখে কবিরও সাহস করে খাওয়া শুরু করলো। নতুন কিছু করার আনন্দ অন্যরকম। খাওয়া আর আড্ডা করতে করতে কখন সময় চলে গেলো কবির টের পায়নি। ভালো লাগলো এর মাঝে শামীমা ম্যাডামের কথা মনে আসেনি। যেই উনার কথা ভাবলো অমনি উনার কল! সামনে উনার ছেলে আয়ানের পরীক্ষা তাই আজকেও পড়াতে যাবে বলে কথা দিয়েছিল। আসবে বলে আসেনি দেখে নিশ্চয়ই সে কারনে কল দিয়েছেন। কল ধরে বলল আজকে বাইরে এসছে। তাই দেরি হয়ে গেছে দেখে আজকে আর আসবেনা। এদিকে আনিকা ফোনে কি একটা মজার ভিডিও দেখে হাসতে হাসতে শেষ। মেয়ের গলার আওয়াজ শুনে ম্যাডাম জিজ্ঞেস করে বসলেন কার সাথে গিয়েছ? রাগ এবং অবাক দুটোই হল ম্যাডামের রাগান্বিত গলার আওয়াজে এই প্রশ্ন শুনে! কবিরও কিছুটা রুক্ষভাবে বলল আনিকার নাম। ম্যাডাম মুখের উপর কেটে দিলেন কল। কবিরও ফিরতি কল করেনি।


ভয় আর ভালোবাসা -- PART 03

  PART : 03  কবির চলে যাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না শামীমা ম্যাডাম। ছেলেটাকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওই টাকাটা দিয়েছিলো কবিরের ভালো...