PART : 03
কবির চলে যাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না শামীমা ম্যাডাম। ছেলেটাকে
অনেক কষ্ট দিয়েছেন। ওই টাকাটা দিয়েছিলো কবিরের ভালোর জন্যই। সেটা ও ভুল বুঝলো। কোন
দোষতো ছিলোনা। ছোট শহরের মা হারা ছেলে। একটু যত্ন আর মায়াতে ভালোবেসে ফেলেছিল।
কিন্তু কখনো নিজে থেকে তো এসে বলেনি কিংবা কোন ধরনের উল্টোপাল্টা ব্যাবহার করেনি।
কিন্তু কিইবা করার ছিলো? ছেলেটার সারল্য, জীবনকে সহজভাবে দেখার চেষ্টা, কষ্টের
অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যাবার প্রচণ্ড ইচ্ছা শক্তি, কিংবা মৃত মায়ের জন্য এত
ভালোবাসা দেখে কোন না কোন ভাবে মনে হয়েছিলো ইস কেউ যদি আমাকেও এমন করে ভালোবাসতো!
ইশ কেউ যদি কথা বলার সময় এরকম মুগ্ধতা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো! কিভাবে
ভালোবেসে ফেলেছে ম্যাডাম নিজেও টের পাননি। মনে মনে বললেন, “আমাকে মাফ করে দিও”
টয়লেটের আয়নার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। আজ অনেক কাঁদবেন। আজকের পর আর না। নিজের
ভাঙা সংসার আর স্বামীর হারানো বিশ্বাস কে ফিরিয়ে আনতে হবে। শফিকের জন্য না হোক,
নিজের জন্য না হোক কিন্তু নিজের বাচ্চাদের জন্য হলেও করতে হবে। নিজেকে বার বার
বুঝালেন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। পারতেই হবে।
বাসায় ফিরে সোজা ওয়াশরুমে গেলো কবির। অপমানে গা ঝাঁ ঝাঁ করছে।
ম্যাডাম কিভাবে ভাবলো কবির ওইসব ছেচড়া ছেলে যারা মানা করার পরও বার বার কল আর
মেসেজ দিয়ে যায়! আর কিভাবে এতোগুলা টাকা দিয়ে বলল চলে যেতে যেন কবির টাকার জন্যই
সবকিছু করেছে! কিভাবে ভাবতে পারলেন উনি। চোখ ফেটে চোখের পানি আসতে চাইছে। না কবির
কাঁদবে না। ম্যাডামের জন্য ওর ভালোবাসা আর সম্মান দুটোই সত্য ছিল। কিন্তু
ম্যাডামের দোষ নেই। কবির জানতো তিনি বিবাহিত এবং তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। তাও নিজের
ইচ্ছেয় জড়িয়েছে। কবির আয়নার সামনে দাড়িয়ে বলল, “আমার দোষ”। ম্যাডামের সুখের জন্য
কবির অনেক দূর চলে যাবে। আবার সেই সেই স্নিগ্ধ সুন্দর চেহারাটা মনে ভেসে উঠলো। সেই
সুন্দর সবুজ চোখ। তবে এবার পার্থক্য হল মাথার সেই ব্যান্ডেজ সহ চেহারাটা মানসপটে
ভেসে উঠলো। ভয়ংকর রাগ উঠে গেলো। নাহ! ওই বেটাকে শিক্ষা দিতেই হবে। বিড়বিড় করে বলল,
“শিক্ষা দিতেই হবে”। ঝট করে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ফার্মেসীর দোকানে গেল। বড়
ফার্মেসীগুলো দূরে। তাই বাসার সাথেই বস্তির পাশে ঘিঞ্জি মার্কা একটা বাজার আছে।
ওখানে একটা ফার্মেসী আছে। সেখানে গিয়ে ম্যাডামের বাসায় দেখা নতুন ঔষধটা কিনলো।
ভাগ্যিস পেয়ে গেছে। নাহলে সেই দূরের বড় মার্কেটে যাওয়া লাগতো। রাগ আর জিদ থাকতে
থাকতে কাজটা করতে হবে কবিরকে। নাহলে আজ সকালে যেরকম ভেবেছিলো ওই বেটা কিছুই করবেনা
আবার সেই মানসিক অবস্থায় ফিরে যাবে। ঔষধে মরুক না মরুক কিন্তু ভোগান্তি অবশ্যই
হবে। ওই বেটার সেই ভোগান্তি প্রাপ্য। বাসায় এসে দেখে ঔষধের এক্সপায়েরি ডেট আর অল্প
কদিন আছে। যাই হোক এখন আসল কাজটা করতে হবে। রুমমেট নেই আজকে। কোন আত্নীয়ের বাসায়
গেসে। ফিরবে দুইদিন পর। ভালো হয়েছে কবিরের জন্য। রাতভর জেগে শাহবাগ থেকে কিনে আনা “নন-স্টেরোইডাল
এন্টি-ইনফ্লেমেটরি” ঔষধগুলো গুড়ো করলো। তারপর ফার্মেসী থেকে কিনা আনা ঔষদের ক্যাপ্সুলের ভেতরের উপাদানগুলো বের করে
ফেলে দিয়ে তার ভেতরে ঢুকালো শাহবাগ থেকে কিনে আনা ঔষধের গুড়া। খুব ধীরে একটা একটা করে। একটা
ক্যাপ্সুলে যতটুকু ঔষধ থাকে তারচেয়ে দুই-তিনগুন বেশি করে ঢুকালো। মনে মনে
বলল,”মরুক ওই বেটা”। একটা ঘোরের মাঝে কাজটা করে ফেলল।
একসপ্তাহ শুধু ভেবেই গেলো কিভাবে এই ঔষধ ম্যাডামের বাসায় রেখে আসবে।
কিভাবে কেউ সন্দেহ করবেনা। আবার মনে হতে লাগলো যা করছে তা আইনত কঠিন অপরাধ। আবার
ভাবলো, যেখানে ম্যাডাম তার স্বামীর গায়ে হাত তোলার ব্যাপার মেনে নিয়ে সংসার করতে চান তাহলে
কবিরের কি দরকার এসব কাজ করে। কিন্তু ম্যাডাম বলেছিল শফিক আমাকে বাঁচতে দিবে না!
একবার যেহেতু সন্দেহ হয়েছে আর গায়ে হাত তুলেছে, তাহলে ওই লোক আবার কোন কারনে যে
গায়ে হাত তুলবেনা তার গেরান্টি আছে? ঘোর দোলাচল।
ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হল। এই এক সপ্তাহ আনিকা পড়া লেখায় অনেক সাহায্য
করেছে কবিরকে। সব সময় কবির পড়া বুঝিয়ে হোক বা এসাইনমেন্ট করে দেয়া হোক। কবিরই
করতো। মেয়েটা সম্ভবত আঁচ করতে পেরেছে যে কবির মানসিনভাবে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে
যাচ্ছে। সকালে শেষ পরীক্ষাটা দিয়ে আনিকাসহ বাইরে দুপুরের খাবার খেলো।সেমিস্টার
ব্রেক। এক মাস আর দেখা হবে না। আজ রাতেই বাসে করে বাড়িতে চলে যাবে।
বিকালে বাসায় ফিরে ব্যাগ গোছালো। ট্রলি ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে রাখা
ঔষধটা বের করলো। নাহ দিবে না। দিতে হলে আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে। ম্যাডামের ওইদিনে
অপমানে পর আর উনার সামনে যাবার মানে হয়না। টাকার ব্যাপারটা খুব গায়ে লেগেছে
কবিরের। বাড়িতে যাবার আগে ভাবলো লাবনীর জন্য কিছু শপিং করবে। এতদিন পর যাচ্ছে।
গিফট পেয়ে খুশি হবে মেয়েটা। মানিব্যাগ নিয়ে দেখলো পর্যাপ্ত টাকা নাই তবে এক সাইডে
ওইদিনের ম্যাডাম থেকে নেয়া টিউশনির বেতনের টাকাটা আছে। এতদিন রাগ করে ওই টাকা খরচ
করেনি। কিন্তু এখন ভাবল, কে আবার ব্যাংকের বুথে যাবে টাকা তুলতে, এখান থেকেই খরচ
করি। টাকা গুনে দেখে এক হাজার টাকা বেশি! কবিরের স্পষ্ট মনে আছে এই টাকা
মানিব্যাগে রাখার পর আর হাত দেয়নি। খরচ করেনি। এই বেশি টাকাটা কি করবে বুঝতে
পারছেনা কবির।
ঐদিনের কথা ভাবতেই আবার রাজ্যর সব অনূভুতি ফিরে এল যা এই দুই সপ্তাহ
পরীক্ষার ব্যাস্ততায় চাপা দিয়ে রেখেছিল। খেয়াল করলো গায়ের টিশার্ট-টা ও ম্যাডামের
উপহার দেয়া। কবিরের জন্মদিনে দিয়েছিলেন। মনের অজান্তেই নিজের গায়ে টিশার্টের উপর
হাত বুলালো। মনে হল যেন শামীমা ম্যাডাম জড়িয়ে ধরে আছেন কবিরকে। পরম ভালোবাসায়।
অমনি ওইদিনের ব্যালকনিতে দাড়িয়ে ম্যাডামকে জড়িয়ে ধরে থাকার ওই মূহুর্ত মনে ভেসে
আসলো। কেমন জানি শীত লেগে উঠলো কবিরের। শেষবারের মত আবার ওই চোখগুলো দেখার জন্য মন
কেঁদে উঠলো। ওই চোখ বার বার কবিরের মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। ঠিক মায়ের মত জলে
ভাসা ভাসা সবুজ চোখ। ঠিক করলো টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আসবে। আসলে আরেকবার দেখার জন্যই
যাচ্ছে।
****
দুই সপ্তাহ হয়ে গেছে শেষবারের মত কবিরকে দেখার। বিকেলের সোনালী আলোর
আভা। চা নিয়ে ব্যালকনিতে বসে আছেন শামীমা ম্যাডাম। মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে
ক্লান্ত লাগছে শামীমা ম্যাডামের। সারাদিন কবিরের কথা ভাবেন। আবার স্বামীর সাথে সব
কিছু স্বাভাবিক করার জন্য দরকারের চেয়েও বেশি আন্তরিক আর ভালোবাসা দেখাতে হচ্ছে।
আর এদিকে বাচ্চাদের ফাইনাল পরীক্ষা। সব মিলিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছেন। তারউপর নিজের
হার্টের সমস্যা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। শফিক নিয়ে গিয়েছিলো ডাক্তারের কাছে।
নতুন ঔষধ দিয়েছে। প্রথম কদিন খেয়ে আর ইচ্ছা করছেনা। আবার নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে।
আগে শফিকের ইচ্ছে হলে ওকে নিয়ে বিছানায় যেত। আর ম্যাডাম মরা কিংবা জড় বস্তুর মত পড়ে
থাকতেন শফিকের শরীরের নিচে। শফিক নিজের ইচ্ছেমত যা করার করে চলে যেত। কিন্তু এই
সপ্তাহে শফিক দুইবার এসেছিল। প্রথমদিন শরীর ভালো লাগছেনা বলে শফিককে গায়ের উপর
থেকে সরিয়ে দিলো। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে যে স্বামীর সাথে সব কিছু আগের মত স্বাভাবিক
করতে পারবেনা। এই ভেবে গত রাতে শফিক আবার আসলে আগের দিনের মত সরিয়ে দিলেননা। কিন্তু পুরোটা সময় শফিকের জায়গাতে কবিরকে ভাবলেন। অনেকদিন পর দৈহিক মিলনে শামীমা ম্যাডাম
নিজেকে ব্যাস্ত করলেন। শফিক খুশি হয়েছে। কিন্তু সকাল থেকে গত রাতের কথা ভেবে
নিজেকে খুব ঘৃনা হচ্ছে। জানেন না কতদিন এই নাটক করা লাগবে। মনে হয় সারাজীবন। আজ
কবিরকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। শেষ একবার।
শামীমা
ম্যাডামের বাসায় যাবে বলে হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কবির। হাতে ওই ঔষধের কোটাটা রয়েই
গেল। পকেটে ঢুকিয়ে রাখলো এই ভেবে যে, বাড়ি যাবার সময় বাসের জানালা দিয়ে বাইরে কোথাও ফেলবে। এইটার আর দরকার নাই। শামীমা ম্যাডামের ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে
দেখে দরজা খোলা। একবার ভাবলো ঘরে ঢুকে পড়বে। টাকাটা রেখে দিবে টেবিলে। কিন্তু
তাহলে তো ম্যাডামের সাথে দেখা হবেনা। শেষবারের মত দেখতে ইচ্ছে করছে। কেন জানি মনে
হচ্ছে আর কোনদিন দেখা হবেনা উনার সাথে। কলিং বেল বাজালো। তাও কেউ আসছেনা। দাঁড়িয়ে
রইলো। পেছন থেকে স্যান্ডেলের আওয়াজ শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখে উনাদের কাজের মেয়ে একটা।
মেয়েটাকে দেখে ভাবলো, এই মেয়ের হাতেই টাকাটা দিয়ে দেই। কেন জানি মন মানলোনা।
তার
বদলে জিগ্যেস করলো, “আয়ান কোথায়”।
আয়ান আর অবনী খালামনির বাসায় গেছে বলে জানালো
মেয়েটা।
ম্যাডামের কথা জিগ্যেস করায় বলল উনি বাসায়। তখনি ম্যাডামের গলার আওয়াজ শোনা
গেল।
কবির ঘরে ঢুকলো। ম্যাডামের হাতে চায়ের মগ। কবিরকে দেখে সেটা হাত থেকে পড়ে
গেল! দুজন দুইজনের দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। কবির খেয়াল করলো ম্যাডামের
মাথায় ব্যান্ডেজটা নাই। তবে কয়েকটা ওয়ান-টাইম ব্যান্ডেজ দেয়া। চোখগুলা আগের মতই
ভাসা-ভাসা আর সবুজ কিন্তু একধরনের ক্লান্ত একটা ভাব। কাজের মেয়েটা দৌড়ে এসে ভাঙা
কাঁচ কুড়ানো শুরু করলে দুইজনই সৎবিত ফিরে পেল।
আগে ম্যাডাম কথা বললেন, খুব আবেগ নিয়ে
বললেন“ তুমি এসছো?”
বুঝতে পারলেন ওইদিনের পর এখন আর এই কথা মানাচ্ছেনা। তাড়াতাড়ি কথার সুর পালটে বললেন,
“তুমি আবার কেন এসছো কবির?”
ম্যাডামের দুইবার দুইরকম কথায় বোকা হয়ে রইলো এক মুহূর্ত। জানালো ঐদিন টাকা নেয়ার
সময় এক হাজার বেশি চলে এসছে।
ম্যাডাম টাকাটা নিতে সাফ মানা করে দিলেন। কবির সামনে এগিয়ে এসে উনার হাতে জোর করে
ধরিয়ে দিলো এবং বলল, “আমার যতটুকু পাওনা আমি ততটুকুই নিব”। সাথে আরো যোগ করল,
“আপনার থেকে বেশি নেয়ার তো প্রশ্নই আসেনা”।
ম্যাডাম কবিরের খোঁচা দেয়া কথার জবাব দিলেন না। মনে মনে বললেন, “তোমার কোন আইডিয়া
নাই আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি”। টাকাটা হাতে নিয়ে ভাঁজ করলেন। কবির চলে যাচ্ছিলো
তখনি ওর হাত ধরে বললেন, “আমি টাকাটা নিব। তবে এক শর্তে। আমার একটা প্রশ্নের উত্তর
দাও।“
কবির অবাক হয়ে গেল। বলল,”কি প্রশ্ন?”
ম্যাডাম বললেন, “তুমি কি সত্যি এই টাকাটা ফেরত দেয়ার জন্যই এসেছ?”
কবির থতমত খেয়ে গেলো। কবির যতই খোঁচা দেয়া কথা বলুক কিন্তু ম্যাডাম ঠিকই বুঝে
গেছেন। কবির এক মুহূর্ত চুপ থেকে ভাবলো সত্যিটা বলে দিবে। যেহেতু আজকের পর আর দেখা
হচ্ছেনা। ম্যাডামের হাত ধরা অবস্থায় বলল, “আমি আজ রাতে বাড়ি চলে যাচ্ছি তাই আপনাকে
শেষবারের মত দেখতে এসছি”। মায়াময় ওই চোখ জোড়ায় স্পষ্ট দেখলো কবিরের জন্য ভালোবাসা।
হাত ধরা
অবস্থা হয়ত এক মুহুর্ত হয়তো হয়নি। ঝট করে ম্যাডাম হাত ছেড়ে দিলেন। ম্যাডাম "শফিক" বলেই হাতটা এমনভাবে তুললেন যেন কাউকে থামাতে চাইছেন। কবির পাশ ফিরে দেখার আগেই
প্রচণ্ড জোড়ে এক লাথি এসে কবিরকে আঘাত করলো। কবির ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বাড়ি খেয়ে
মেঝেতে পড়ল। ঘটনার ধাক্কায় কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে এক মুহূর্ত ওভাবেই রইলো।পরের
মুহূর্ত নিজেকে আবিষ্কার করলো পাঁচ ফুট এগার ইঞ্চি লম্বা, চওড়া আর পেটানো শরীরের
শফিক সাহেবের হাত কবিরের গলায়। কবিরকে তুলে ওয়ালের সাথে ঠেসে ধরে আছেন। প্রচণ্ড
জোরে গলায় চাপ দিয়ে ধরেছেন। ম্যাডাম চেষ্টা করছেন নিজের জামাই থেকে কবিরকে ছাড়ানোর
জন্য। ব্যার্থ চেষ্টা। শফিক সাহেব কবিরের মুখের কাছে মুখ এনে হিস হিসে গলায় বললেন,
“ওই ছোটলোকের বাচ্চা! তোর মা কি কুত্তার সাথে শুয়ে তোকে পয়দা করেছে”?
কবিরের সারা শরীরে আগুন ধরে গেলো ওর মাকে নিয়ে এমন নোংরা কথা শুনে। নিজের সর্বোচ
দিয়ে চেষ্টা করলো শফিক সাহেব কে ঠেলে সরিয়ে দিতে। কিন্তু পারলোনা। উল্টো সবকিছু
ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো। শফিক সাহেব অনবরত গালি দিয়ে যাচ্ছেন কবিরের মাকে জড়িয়ে।
এদিকে ম্যাডাম কান্না জুড়ে দিয়ে শফিকের পায়ে ধরে বললেন যেন কবির কে ছেড়ে দেয়। আর
বলতে লাগলেন, “আমার সাথে ওর কিছু নেই। আমি তোমাকেই ভালোবাসি শফিক”।
এতে কাজ হল। হাত আলগা হল। কবিরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনছিস? আর লজ্জা থাকলে
এখানে আসবিনা ****র বাচ্চা”।
কাজের মেয়েটা রান্না ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আতংকিত চোখে তাকিয়ে আছে। কবির
লজ্জা, আপমান আর ঘৃনায় মাথা নিচু করে ফেলল।তাকিয়ে দেখে ম্যাডাম নিচে বসে কাঁদছেন।
কবির চায়না আর কোন কান্ড করতে। ম্যাডামকে কান্না করাতে চায়না। তবে ওর মাকে নিয়ে যা
যা বলেছে তার শাস্তি দিবে ওই বেটাকে। মাথায় বুদ্ধি এলো আর সাথে সাথে সিদ্ধান্ত
নিয়ে ফেলল।
নিচে বসে থাকা ম্যাডামকে যখন উনার স্বামী পাশে বসে শান্ত করার চেষ্টা করছেন তখনি
কবির পকেট থেকে ওই ঔষধ বের করে আস্তে করে টেবিলে রাখলো। আর টেবিলের উপরে রাখা আগের
ঔষধটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল। বদলে দিলো ভালো ঔষধের সাথে খারাপ ঔষধের কৌটাটা।
ম্যাডাম অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। উনাকে নিয়ে শফিক সাহেব রুমে চলে যাচ্ছেন। যাওয়ার সময়
কবিরের দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালেন। কবির সেটা দেখেও না দেখার মত করে ঘর থেকে
বেড়িয়ে এল। বের হতেই কারেন্ট চলে গেলো। মনে মনে বলল, “এটার শাস্তি তুই শিগ্রই
পাবি!”
****
বাস রাতের এগারোটায়। এখনো অনেক সময় বাকি। এই আবাসিকে আর থাকবেনা। ভাবলো অদ্ভুত
শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরবে। শেষবারের মত। এই আলো আধাঁরি রাস্তায় হাটতে ইচ্ছে
করছে যেন কেউ না দেখে কবিরকে। একবার শফিক সাহেবের মুখ থেকে আসা নোংরা গালিগুলো
কানে বাজছে। আরেকবার ম্যাডামের স্বামীর উদ্দস্যে বলা “আমি তোমাকেই ভালোবাসি শফিক”।
কোন কথা বেশি কষ্ট দিচ্ছে কবির বুঝতে পারছেনা।
হাঁটতে হাঁটতে ওই অদ্ভুত রাস্তার
মোড়ে এল। এখন আর আগের মত অদ্ভুতও লাগেনা। মনে হয় এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আজ তা
হলনা। সব দিনের মত কুকুরগুলো ল্যাম্পপোস্টের উপরে অদৃশ্য কিছুর দিকে না তাকিয়ে
কবিরের দিকে তাকিয়ে একসাথে ঘেউ ঘেউ করে উঠলো! কুকুরগুলো ভয়ে একটু পেছনে সরে গিয়েও প্রাণপণে
ঘেউ ঘেউ করে যেতে লাগলো যেন ওরা অস্বাভাবিক কিছু দেখছে। কুকুরগুলোর চোখে কবিরের
জন্য ঘৃনা দেখতে পেল। অবাক তো হলই সাথে প্রচণ্ড ভয় লাগলো। বুঝতে পারলোনা কেন কুকুরগুলো এমন করলো আজ। দৌড়াতে লাগলো যতক্ষন না ওর বাসা এলো।
একটা ঘোরের মাঝে কয়েকটা ঘন্টা গেল। নিজেকে হেরে যাওয়া একজন মানুষ মনে
হচ্ছে। ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ারের নিচে দাড়ালো। সন্ধ্যায় যা হয়েছে সেগুলো বাদ দিয়ে
এখন কেমন জানি কুকুরগুলো কথা মাথায় আসছে। বার বার মনে হচ্ছে, কেন আজ ওকে দেখে এমন করলো কুকুরগুলো? ম্যাডাম,
আয়ান, শফিক সাহেবের সাথে সাথে ওই কুকুরগুলোও কবিরকে ঘৃনা করে।
****
বাস সাড়ে ১১টায়। বাস কাউন্টারে যাচ্ছে রিকশায়। রাত হতেই এলাকার
কুকুরগুলো টহল দেয়া শুরু করে দিয়েছে। ওদের দেখে কবিরের আবার ওই শর্টকাট রোডের কুকুরগুলোর কথা
মাথায় আসলো। কি হচ্ছে এসব কবিরের সাথে। শান্তি পাচ্ছেনা মনে। কুকুরগুলোর এমন আচরন বার বার খোঁচাচ্ছে কবিরকে। বাস কাউন্টারে নামলো।
বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। এখনো সেই কুকুরের ঘৃনাভরা মুখ গুলো কল্পনায় দেখতে পেলো। কাউন্টারের সামনে দিয়ে যাওয়া প্রতিটা গাড়ীর হেডলাইট গুলোকে কুকুরের চোখের মত লাগছে। ঝাপসা লাগছে সব কিছু। একটুপর বাস আসলো। উঠে গিয়ে নিজের সিটে বসলো। বাস ছেড়ে দিতেই মাথাটা সিটে্র সাথে লাগালো।
তারপর ঝট করে সোজা হয়ে বসল। মনে হল মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছে। এখন বুঝতে পেরেছে কেন
কুকুরগুলো এমনভাবে আচরন করেছিল। কবির শফিক সাহেবকে শাস্তি দেয়ার জন্য ভুল ঔষধ রেখে
এসছে। কঠিন অপরাধ। ওই লোক মারা যেতে পারে। রাগ, জেদ, অভিমান আর প্রতিশোধের নেশায় কবির কাউকে মেরে ফেলার ফাঁদ পেতে এসেছে! ওই লোক মরে কি মরে না সেটা পরের ব্যাপার। কিন্তু আজ নিজের বিবেককে মেরে ফেলেছে কবির। প্রচণ্ড অনুশোচনা হচ্ছে। খুনি মনে হচ্ছে। সেটা হয়তো কুকুরগুলো অনূভব করেতে পেরেছিল।
কবির বাসা থেকে চলে যাবার পর হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো শামীমা ম্যাডাম। বুক
ধড়ফড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। এখনো করছে। ওর শরীর খারাপ দেখে শফিক আর চিৎকার চেঁচামেচি
করেনি। কিন্তু বলেছে কাল গিয়ে দেখবে কবির এখনো এই এলাকায় আছে কিনা। থাকলে নাকি
জানে মেরে ফেলবে। কবির বলেছিল আজ রাতেই বাড়ি চলে যাচ্ছে। কাল তাহলে আর কোন সমস্যা
হবেনা। সন্ধ্যার ঘটনা বার বার মনে আসছে। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে। একমাত্র তার
জন্য কবির, শফিক আর পুরো পরিবার এলোমেলো হয়ে গেছে। ভালোবাসা অনেক বছর আগে শফিক আর
তাকে এক করেছিল। আজ অনেক বছর পর সেই ভালোবাসাই সবাইকে আলদা করে ফেলল।
শফিক আগে ভাগেই না খেয়ে শুয়ে পড়েছে। শামীমা ম্যাডাম রুমে ঢুকেই দেখলেন রুম খুব
ঠান্ডা। এসি আর ফ্যান দুটোই চলছে। কি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে শফিক যেন সন্ধ্যায় কিছুই
হয়নি। যেন কিছুই করেনি। মনে পড়ল সন্ধ্যায় শফিকের পায়ে ধরে বলেছিল কতটা ভালোবাসে। মিথ্যে বলেছিল। কেমন জানি অদ্ভুত
লাগলো মনের ভেতর। একবার মনে হল একটা ছুরি এনে শফিকের বুকের বাঁ পাশে বিঁধে দেয়।
শান্তিতে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়ুক। ঘোরের মাঝেই রান্না ঘর থেকে একটা ছুরি নিয়ে এসে ঘুমন্ত স্বামীর
সামনে এসে দাড়ালেন। ডাইনিং থেকে আসা আলোয় শফিককে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বিছানার পাশের
ড্রেসিং টেবিলের বড় আয়ানায় ছুরি হাতে নিজেকে দেখ্লেন। চমকে উঠে হাত থেকে ছুরিটা
পাপসে পড়ল। পাপসে পড়ায় তেমন আওয়াজ হলোনা। শফিক একটু নড়ে পা টা তুলে কোল বালিশে উপর
রাখলো। আগে থেকেই সামান্য উপরে উঠে থাকা লুঙি ফ্যানের বাতাসে হাঁটুর অনেকটা উপরে উঠে গেল।
শফিক শান্তিতে হাল্কা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। নিজেকে গালি দিলেন। কি করতে যাচ্ছিল এসব!
নিজেকে আয়নায় দেখে ভয় লাগলো শামীমা ম্যাডামের। আয়না থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে শফিকের
দিকে তাকা্লেন। ডান পায়ের উরু পর্যন্ত নগ্ন হয়ে আছে। হাত দুটো বাচ্চাদের মত মাথার
উপরের দিকে তুলে ঘুমাচ্ছে। হালকা লোমশ বুক। লোমগুল লম্বা রেখা হয়ে নাভি পর্যন্ত
নেমে গেছে। মনে আছে এই শরীরের প্রতিটা অংশ চেনা শামীমা ম্যাডামের। বিয়ের পর একসময়
শফিকের এই গোসল করে বের হওয়া টাওয়েল পেছানো অর্ধনগ্ন শরীর দেখে হাটু দূর্বল হয়ে আসতো। তলপেটে ব্যাথা
করত। কত কত দিন শফিককে অফিসে যেতে দেরি করিয়ে দিয়েছে তার হিসাব নাই। আহা কোথায়
হারিয়ে গেছে সেই দিন। শফিক এখনো বদলায়নি যদিও হার্টের অসুখ ধরা পড়েছে। শুধু একটু ভুড়ি বেরিয়েছে।
মনে আছে
একবার কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রে গোসল করার সময় এক লোক বাজেভাবে তাকানোর কারনে
শফিক ওই লোককে সমুদ্রের পানিতে ডুবিয়ে মারতে গিয়েছিল। আজও তো তাই করেছে। কবিরকে
গলা টিপে একটুর জন্য মেরেই ফেলত। এগুলোতো ভালবাসার কারনেই করেছে। নিজের বৌকে অন্যদের থেকে বাঁচাতেই করেছে। যে মানুষটা
তাকে এত ভালোবাসে সে মানুষকে শামীমা আর কেন ভালোবাসেনা বুঝতে পারছেনা।
গত পাঁচ
বছরে টাকা পয়সা অনেক বেড়েছে কিন্তু ভালোবাসা কেন কমে গেল? সব থাকার পরও কেন দিন
রাত একা একা লাগতো? এইসব প্রশ্ন ভেবে নিজেকে আরো বেশি অপরাধী মনে হতে লাগলো।
নিজেকে খারাপ মানুষ মনে হতে লাগলো। মনে মনে বললেন, “আজ থেকে আমাকে সব ঠিক করতে
হবে”। ডাইনিং রুমে গিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলেন। কবিরের মোবাইল নম্বরসহ সোশাল মিডিয়া
থেকে, ভাইবার থেকে ব্লক করে দিলেন। মোবাইলটা টেবিলে আবার রাখতে গিয়ে দেখলেন কদিন
আগে ডাক্তারের দেয়া নতুন ঔষধের কৌটা। কদিন খেয়ে আর খাননি। মনে পড়লো কবির এই কৌটা
হাতে নিয়ে বলেছিল এটা শফিকের কিনা। খুব মেজাজ খারাপ হল নিজের উপর। এত কিছুর পরও
কেনো কবিরের কথা ভাবছে! যেহেতু ঠিক করেছে আজকে থেকেই সব ঠিক করবে তাই কৌটা খুলে
একটা ঔষধ বের করলেন। মনে মনে ভাবলেন, “নাহ আজকে একটাতে হবেনা"।
সব সমস্যা এই
হার্টের যে কোন কারন ছাড়াই আগের মত স্বামীকে ভালোবাসতে পারছেনা”। আর তিনটা ঔষধ
নিলেন।
কবির কি করবে এখন বুঝতে পারছে না। তারউপর বাসে দুইজন লোক সিট নিয়ে কি
একটা ঝামেলা হয়েছে সেটা নিয়ে কঠিন তর্ক করছে। ভাবতে ভাবতে ঠিক করলো ম্যাডামকে
মেসেজ দিয়ে বলবে ঐ ঔষধ শফিক সাহেবকে না দিতে। মেসেজ সেন্ট হলনা। মোবাইল বা ভাইবার
কোনটাতে না। একটু পর আবার দিলো। সেন্ট হলোনা। ঠিক করলো কল দিবে। কল ও গেলো না।
মাথা কাজ করছেনা কি হল। একটু পর বুঝতে পারলো ম্যাডাম উনাকে ব্লক করে দিয়েছে। না
চাইলেও ভাবতে কষ্ট লাগলো। ওই লোক দুটোর তর্ক এখন প্রায় হাতাহাতিতে রুপ নিচ্ছে।
বাসের গাইড এসে মিমাংসা করে দেয়ার চেষ্টা করছে। বাসে তর্ক করা লোক দুটোকে পেরিয়ে
সামনে গিয়ে ডাইভারকে বলল বাস থামান। ড্রাইভার সাফ মানা করে দিয়ে বলল এটা লোকাল বাস
না যে যেখানে সেখানে থামাবে। এদিকে শেষ কাউন্টার পার হয়ে চলে গেছে। কবির আসল
কারনটা ড্রাইভারকে বলতেও পারছেনা। এদিকে বাস ড্রাইভার বাসের ভেতরে ঝগড়া দেখে চরম
মেজাজ খারাপ করে আছে। একটু পর পর গালি দিচ্ছে। তারপরও ড্রাইভারকে বলল বাসায় ঔষধ
রেখে এসছে। তাই নেমে যাবে। এই কথা শুনে ড্রাইভার দাঁত্মুখ খিঁচে গালি দিতে নিয়েও
দিলোনা। কিন্তু ধমকের সুরে বলল গন্তব্যে পৌছানোর পর আরেকটা কিনে নিতে কারন ঔষুধের
দোকানের অভাব নাই দেশে। কবির কয়েকবার বলায় ড্রাইভারের চোখে সন্দেহ দেখতে পেল। ড্রাইভার
কবিরকে চুপচাপ সিটে গিয়ে বসতে বলল। কবির ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মারপিটের আওয়াজ শুনে
ঘুরে তাকালো। দেখলো ঝগড়া করা একজন আরেকজনের গলা চেপে ধরে আছে আর জঘন্য সব গালি
দিচ্ছে। কবিরের সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে গেলো।
****
ঔষধ খেয়ে এসে নিজের স্বামীর দিকে তাকালেন শামীমা ম্যাডাম। আগের মতই
ঘুমাচ্ছে। বুকের ধড়ফড় কমছেই না। কাল আবার যাবে নাহয় ডাক্তারের কাছে। কেমন জানি ঘোর
ঘোর লাগছে। ভাবলেন শফিকের কাছাকাছি শুলে হয়ত ভালো লাগবে। কোল বালিশটা সরিয়ে আসতে
করে শফিক সাহেবের বুকে মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। পুরনো দিনের কথা ভেবে পা একটা উনার
গায়ে তুলে দিলেন। এভাবেই তো ঘুমাতেন ৫ বছর আগে যখন সব ঠিক ছিলো।
বাসেই ওই দুইজনের গলা চেপে ধরা দেখে মনের অজান্তে নিজের গলায় হাত চলে
গেল। কেমন জানি দাগ হয়ে গেছে গলায়। ড্রাইভার নিশ্চয়ই সেটা দেখে কবিরকে এমন
সন্দেহের চোখের তাকিয়েছে। সিটে গিয়ে আরো কয়েকবার কল দিলো। খুব ক্লান্ত লাগছে। গা
ভেঙ্গে আসছে। শিশু পার্কে বাচ্চারা যেমন স্লাইডারে পিচ্ছলে নিচের দিকে নামে, কবিরের মনে হচ্ছে সে অনবরত নিচের দিকে নেমেই যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। থামছেনা। মনে হয় জ্বর গায়ে। বাসের জানলা দিয়ে আসা বাতাসে চোখ লেগে এলো।
স্বপ্নে দেখলো ওই কুকুরগুলো কবিরকে তাড়া করছে।
২৫ দিন পর…
লাবনী সহ বসে কাঁচা মরিচ দিয়ে টক আমের ভর্তা খাচ্ছে। ছোটমা বলেছেন টক খেলে নাকি
মুখের রুচি ফিরে আসে। ঢাকা থেকে ফেরার সময় প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বাস থেকে নেমেছে।
কিভাবে নিজের বাড়ি গেছে বলতেই পারেনি। টাইফয়েড জ্বর। দুই সপ্তাহ রুমেই কাটিয়েছে।
কয়েকদিন হল অনেকটা ভাল লাগছে কিন্তু কিছুই খেতে ইচ্ছা করেনা।
অসুস্থতার জন্য ঢাকায় যা যা হয়েছে সেগুলো নিয়ে ভাবার মানসিক শক্তি পায়নি। হয়তো
কিছুই হয়নি। হলে তো ম্যাডাম কল করতেন। উনি নিজের মুখে বলেছেন যে কবিরকে না শফিক
সাহেবকেই ভালোবাসেন।তাই হয়তো কবিরকে জীবন
থেকে ব্লক করে দিয়ে স্বামী নিয়ে ভাল আছেন। থাকুক। অনেক ভালো থাকুক যেভাবে আছেন।
অসুস্থতার পুরোটা সময় আনিকা খোঁজ খবর নিয়েছে। নতুন বাসা ঠিক করতে
সাহায্য করেছে। কবিরের হয়ে নতুন সেমিস্টারের কোর্স রেজিস্ট্রেশন করে দিয়েছে। তবে
তারচেয়ে বেশি দুঃচিন্তা আর দৌড়াদৌড়ি করেছেন কবিরের বাবা। কবির সব খেয়াল করেছে।
আগের মত বাবার প্রতি রাগ নেই। গত মাসে ঢাকাতে যা হল সেই ঘটনায় কবির ভালোভাবে বুঝতে
পেরেছে কাছের মানুষ কে আর ভালোবাসি বলে পর করে দেয় কে। ভেবেছিলো আর ঢাকা যাবেনা। কিন্তু পরে ঠিক করলো যাবে। এই
পরিবারের হাল ধরার জন্য না হোক অন্তত এই বোনের দায়িত্য নেয়ার কথা ভেবেই কবিরকে
ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনা শেষ করতে হবে। ভাল চাকরি করতে হবে।
ঢাকায় গিয়ে নতুন ক্লাসে গেল। সেমিস্টার ফি জমা দিল। আনিকা সহ
ইউনিভার্সিটি ক্যান্টিনে একসাথে দুপুরের খাবার খেলো। আনিকাকে রিকশায় তুলে বিদায়
জানিয়ে সামনে তাকাতেই দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার ওই পাশে। কবির ঠিক কি বলবে
বুঝতে পারছেনা। টিউশনি ছেড়ে দেয়ার আগে থেকেই আয়ান কবিরের সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথা
বলতোনা। নিজের মায়ের সাথে কবিরকে এমনভাবে দেখেছে যে স্বাভাবিক ব্যাবহার আশা করাই
ভুল। এইসব ভাবছে আর যাবার জন্য পা বাড়াতেই ছেলেটা দৌড়ে এসে কবিরকে জড়িয়ে ধরলো।
বয়োসন্ধিতে পড়েছে ছেলেটা। লম্বায় কবিরের সমান প্রায়। জড়িয়ে ধরেই কান্না করা শুরু
করলো। কবির থতমত খেয়ে গেলো। মানুষজন দেখছে। কবির ওকে একটু দূরে নিয়ে গেলো। কি
হয়েছে কাঁদছে কেন জিজ্ঞাস করায় যা বলল সেটার জন্য কবির প্রস্তুত ছিলোনা।
“পাপা আমার মাম্মিকে মেরে ফেলেছে। হি মার্ডারড হার”!
মেরে ফেলেছে মানে? বার বার এই প্রশ্ন করতে লাগলো যেন কি বলেছে বুঝতে
পারেনি।
“মাম্মি নাই মাম্মি নাই। আমার কারনে মাম্মি মারা গেসে”
কবিরের হঠাত মাথা ঘুরিয়ে উঠে বমি বমি লাগতে শুরু হল। সব শূন্য লাগছে।
নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছেনা যে ম্যাডাম আর নেই! কান্নার আওয়াজ না এসে জান্তব একটা
আওয়াজ বের হতে লাগলো। আয়ানকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে একটা গাছ ধরে কোন রকম দাঁড়িয়ে রইলো।
এভাবে কতক্ষন গেলো জানেনা। আয়ান কবিরের কাছে এসে হাতটা ধরে বলল, “স্যার আমি জানি
মাম্মি আপনাকে অনেক ভালোবাসতো। আমি দেখেছি সিঁড়িতে আপনাদের। একদিন বাবার সন্দেহ
হলে কাজের মেয়েদের জিগ্যেস করেন। ওদেরকে অনেক বকা দিলে আমি ভয় পেয়ে পাপাকে বলে দেই
আপনাদের ব্যাপারে। পাপা ঐদিন মাম্মিকে অনেক বকা আর মার দিয়েছিলো। সেদিন মাম্মিকে
অনেক হেট করেছি। আপনাকেও খুব হেট করেছি কারন ভাবতাম আপনার জন্য এমন হয়েছে। কিন্তু
মাম্মির মাথায় কাটা দেখে ভয় পেলে মাম্মি বলেছিলো, তোমার পাপা যে অনেক ভালোবাসে সেজন্য
এমন কেটেছে। এরপর আরো একদিন মেরেছে। পরে ভাবলাম ভালোবাসলে মারবে কেন?। আপনিও
মাম্মিকে ভালোবেসেছিলেন কিন্তু আপনি তো মাম্মিকে মারেন নি।“
কবিরের সব এলমেলো লাগছে। মাথায় হাজারটা কথা ঘুরছে। কোথায় ভেবেছিলো
ম্যাডাম সুখে আছে স্বামী নিয়ে। এখন আয়ান বলছে ম্যাডামকে নাকি শফিক সাহেব মেরে
ফেলেছে! নিজেকে প্রচণ্ড অপরাধি মনে হচ্ছে। কোন রকমে জিগ্যেস করলো কখন হয়েছে এই
ঘটনা। জিগ্যেস করায় সামনে যে উত্তর আসবে সেটা যদি জানতো তবে কবির জিজ্ঞ্যেসই
করতোনা।
আয়ান বলল, “কাজের
মেয়ের কাছে শুনেছি আপনি আরো একদিন এসেছিলেন। সেদিনই মেরে ফেলা হয়েছে আমার
মাম্মিকে। আমি খালা মনির বাসায় ছিলাম। ঐদিন নাকি পাপা আপনাকে অনেক মেরেছে। তারপর
নাকি আর কিছুই হয়নি। কিন্তু আমি নিশ্চিত পাপা রাতের বেলা মাম্মিকে মেরে ফেলেছে”।
কবির তাকিয়ে আছে। মাথায় ঘুরছে ম্যাডামেই ওই মেসেজটা। শফিক আমাকে বাঁচতে দিবেনা। আয়ান
আরো বলে গেল, “কিন্তু জানেন পাপা সবাইকে মিথ্যে বলেছে। আমাদের সবাইকে বলেছে মাম্মি
নাকি ঘুমের মাঝেই মারা গেছে। আবার বলল এক্সপায়েরি ডেট চলে যাওয়া ঔষধ খাবার কারনেই
নাকি মারা গেসে”।
এক্সপায়েরি
ডেট চলে যাওয়া ঔষধ কথাটা শুনে বুকে ধক করে উঠলো কবিরের। আবার জিগ্যেস করলো আয়ানকে
যেন শুনতে পায়নি। “কোন ঔষধ”।
আয়ান বলল, “মাম্মিকে ডাক্তার আগের ঔষধ চেঞ্জ করে দিয়ে নতুন একটা ঔষধ দিয়েছিল। কি
জানি নামটা…”। আয়ান মনে করার চেষ্টা করছে।
কবির আতংকিত চোখে তাকিয়ে আছে আয়ানের দিকে। মনে মনে দোয়া করছে যেন সেই
ঔষধটা না হয় যেটা সে ম্যাডামের বাসায় টেবিলের উপর রেখে এসছে। মনে পড়ছে সেদিনের কথা
যেদিন ওই ঔষধের কৌটায় খারাপ ঔষধ ঢোকানোর পর খেয়াল করেছিল যে এক্সপায়েরি ডেট প্রায়
শেষ। কবিরের আতঙ্ক বাস্তবে পরিণত হল! আয়ান ঠিক সেই ঔষধের নামই বলল যেটা কবির খারাপ
দিয়ে পালটে এসছে। কবিরের বিশ্বাস হলোনা প্রথমে। বলল, “সেটা তো তোমার পাপার ঔষধ”!
আয়ান তাকিয়ে রইলো এই ভেবে যে কবির কিভাবে জানে এইটা পাপা নাকি মাম্মির ঔষধ। আর কার
ঔষধের চেয়ে আসল ব্যাপার হল পাপা মেরে ফেলেছে মাম্মিকে। ঔষধের ব্যাপারটা তো পাপার
বানানো কথা। আয়ান কিছু বুঝতে পারছেনা কেন কবির ঔষদের কথা জিগ্যেস করলো। বলল, “না
এটা মাম্মির ঔষধ। ডাক্তার নতুন দিয়েছিলো”।
মাথায় ঝড় বইছে। মনে পড়লো কবিরের। ঐদিন যখন ম্যাডামকে জিগ্যেস করেছিল
এই ঔষধ শফিক সাহেবের কিনা তখন উনি কিছুই বলেন নি। কবির ধরেই নিয়েছিলো এটা শফিক
সাহেবের ঔষধ। সেই মুহূর্তে মাথায় ছিলোনা ম্যাডাম জন্মগত ভাবেই ডেক্সটোকার্ডিয়া রোগী।
ভাঙা মন আর প্রতিশোধের নেশায় এই সাধারন জিনিসটা মনে ছিলোনা। শফিক সাহেবকে শাস্তি
দিতে গিয়ে আজ ভালোবাসার মানুষটার মৃত্যু হয়েছে আর কবির যেন জীবিত হয়েও মরে গেছে।
একটা চিৎকার দিয়ে মাটিতে বসে পড়লো কবির। নিজের উপর রাগ, অপরাধবোধের
যন্ত্রণা আর প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার কষ্ট একসাথে একই সময়ে হলে কেমন লাগে
সেটা কবিরই শুধু বুঝতে পারলো। আয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে স্যার মাম্মিকে
কতটা ভালোবাসতো। আয়ানের চোখ দিয়েও পানি পড়ছে। ভাবছে পাপাকে ওই সিঁড়ির ঘটনা বলে
দেয়া উচিত হয়নি। না বললে আজ মাম্মি বেঁচে থাকতো।
আয়ান কবিরের
কাছে গিয়ে বসলো। বলল, “আমি সবাইকে বলছি কেউ আমার কথা বিশ্বাস করেনি। শুধু আপনি
করেছেন। আমি পুলিশ ডাকতে বলেছি। কিন্তু পাপা আর খালামনিরা ডাকেনি। মাম্মির মাথায়
কাটা দাগ দেখলে যে পুলিশ সন্দেহ করবে সেজন্য।“
কবির আয়ানের মুখের দিকে নিঃশব্দ চেয়ে রইলো।
“আই হেট দ্যাট ম্যান”। সুস্পষ্ট শব্দে বলল আয়ান। সাফ জানিয়ে দিলো সে আর তার বাবার
মুখ দেখবেনা। আরো জানালো সে এখন থেকে খালামনির কাছেই থাকবে।
কতক্ষন ওভাবে ঘাসের উপর বসেছিলো জানেনা কবির। শফিক সাহেবের জন্য খুব
খারাপ লাগছে। নিজের বৌ হারিয়েছেন। আর এখন ছেলেও উনাকে ঘৃণা করে। এলোমেলো
গন্তব্যহীন হাঁটছে। আয়ান হাত ধরে আছে। কবির নিজের হাতের দিকে তাকালো। এই হাত
দিয়েই সেই ঔষধ বানিয়েছিল। ঐ বাসায় রেখে এসেছিল। আজ সেই হাত আয়ান ধরে আছে। আয়ানকে কিভাবে
বলবে এই সত্যিটা? থেমে ছেলেটার মুখের দিকে তাকালো। আয়ানও তাকিয়ে আছে। হালকা গোঁফের
রেখা নাকের নিচে। আয়ানের মাঝে নিজেকে দেখলো। ঠিক ওর বয়সেই তো মাকে হারিয়েছিল। ঠিক
এই বয়স থেকেই তো বাবাকে ঘৃণা করে এসেছিলো কবির। খুব মায়া হল ছেলেটার জন্য। সামনে
কবিরের মত কঠিন সব দিন অপেক্ষা করছে ছেলেটার জন্য। জড়িয়ে ধরে স্নেহ করতে গিয়ে আবার
নিজেকে আঁটকে ফেলল। ভাবছে না জানি কবিরের জন্য আয়ানেরও কোন সমস্যা হয়! কবিরই তো
দায়ী সবকিছুর জন্য। এই মা হারা ছোট ছেলেটার সামনে ভয় আর ভালোবাসা একসাথে অনুভব
করলো।












