মায়া মমতা ভালবাসা এগুলোর প্রতিদান হয়না। কিন্তু আমরা যখন কারো জন্য কিছু করি অনেকটা আনমনেই একই রকম বিনিময় আশা করে বসি। একটা না বলা চাওয়া থেকেই যায়। ঠিক একই ভাবে কেউ আমাদের জন্য ভাল কিছু করলে আমরা চাই এর বিপরীতে কিছু অন্তত করি৷ কিন্তু কেমন হয় যখন কেউ আমাদের জন্য কিছু করল তার জন্য সারাজীবন মনে দাগ কেটে যায় কিন্তু বিনিময়ে কিছুই করা হয়না!? এই স্মৃতিচারণ সেই বিষয় নিয়ে।
ক্লাস সিক্সে তখন আমি। বয়েজ স্কুল। একটা ফ্রেন্ড রেজাউল। খুব ফর্সা, চিকন আর কিছুটা কোকড়ানো চুল। কিন্তু ওর চেহারার সবচেয়ে আগে যা চোখে পড়ে তা হল সবুজচোখ যাকে আমরা ফাজলামো করে বলি বিলাইর চোখ! পড়ালেখায় ভাল না। প্রায় স্যারের হাতে মার আর বকা। খুব মায়া হল ওকে মার খেতে দেখে। বিশেষ করে সেদিন, যেদিন স্যার মারবে বলে বেত তুলল কিন্তু ও হাত সরিয়ে ফেলায় মিস হয়ে গেল মার! স্যার রেগে গিয়ে আরো অনেক মারল সেদিন। একদিন পাশে বসায় ক্লাস শুরুর আগে একটা পড়া বুঝায় দিলাম। সৌভাগ্যবশত স্যার পড়া জিজ্ঞেস করায় মোটামুটি উত্তর দিতে পারল অতঃপর মার থেকে বাচল! সেই থেকে ওকে পড়াতাম। খেয়াল করলাম পড়ালে ঠিকই পারে। টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় মোটামুটি পাশ করল। কি খুশি সেদিন। আমিও বুঝলাম কাউকে পড়াতে ভাল লাগে আমার।কদিন ধরে দেখি মুখ শুকনো করে রাখে। বলল ওর বাবার চাকরি চলে গেছে। বাসায় বাজার নাই। প্রতিদিন নাকি আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খায়। কি খারাপ লেগেছিল ওইদিন ওর কথা শুনে। সেদিন বাসায় গিয়ে যখন আব্বু, আম্মুকে অভিযোগ করছিলেন মুরগির মাংসের সাথে প্রতিবারই কেন আলু দেয়া লাগবে বলে তখন নিজেকে অনেক ছোট মনে হচ্ছিল। কারো একমাত্র খাবারই আলু। আর আমরা অভিযোগ করছি সেটা নিয়েই। বুঝলাম এই পৃথিবী কতটা আনফেয়ার!
কয়েকমাস স্কুলের বেতন দিতে পারছেনা বলে স্যার প্রতিদিন বকা দিতেন। একদিন দেখি ও ক্লাসে আসে নাই। পরের দিন ও না। এভাবে প্রায় 2 সপ্তাহ আসল না। পরে একদিন আসলো ক্লাসে। কেন আসেনাই জিজ্ঞেস করায় বলল ওর বাবা সহ কদিন ধরে ভ্যান চালিয়েছে। তাই ক্লাসে আসতে পারে নাই। কিন্তু বেতনের টাকা জোগাড় হয়নি। ওই সুন্দর সবুঝ চোখে রাজ্যের কষ্ট কিন্তু মুখে হাসি রাখার প্রানান্ত চেষ্টা! খুব মায়া হল। তাই অনেকদিন ধরে জমানো 500 টাকা ওকে দিয়ে দিলাম যেন বেতন আর পরীক্ষার ফি দিতে পারে। এই টাকাটা অনেকদিন ধরে চেষ্টা করে জমানো। আমার হাতে কেন জানি টাকাই থাকেনা। খরচ করি কিভাবে তাই জানিনা। শার্লক হোমসের রচনা সমগ্র কিনব বলে, আর ব্যাডমিন্টন এর ব্যাট কিনব বলে জমিয়েছিলাম। টাকাটা নিতে চাইছিলনা। আবার না নিয়েও উপায় ছিলনা তখন ওর।
এই টাকাটা নেয়ার আগ পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু পরের দিন থেকে খেয়াল করলাম ওর ব্যাবহার অন্যরকম। কিছুটা বস আর এমপ্লয়ি এর রিলেশনের মত হয়ে গেল! আমি বেঞ্চে বসার আগে কাগজ দিয়ে ধুলো মুছে দিতে লাগল। কিংবা সিংগাড়া খাওয়ার সময় আলুর টুকরা আমার হাটুতে পড়লে পানি দিয়ে দাগটা তুলে দেয়ার কি চেষ্টা ওর! আমার সব কথায় হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাত। আমি বিরক্ত হতাম খুব। কিভাবে যেন আমাদের বন্ধুত্বটা 'বস আর এমপ্লয়ি' এর মতন বদলে গেল। টাকাটা ফেরত দিতে পারছেনা বলে অন্যভাবে প্রতিদান দেবার প্রানান্ত চেষ্টা ওর। আমি টাকাটা ওকে ফেরত দেবার জন্য দেই নাই। তাও এমন ব্যবহার ভাল লাগেনি। আমি আস্তে আস্তে কিছুটা সরে আসতে থাকলাম। ও মনে হয় বুঝতে পেরেছিল। সেজন্যেই মনে হয় আর পড়া বুঝতে আসতনা। পরীক্ষায় কত পেয়েছে জিজ্ঞাসার উত্তরও দেয়নি অভিমান করে।
এভাবেই যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার স্কুল শেষে ক্রিকেট খেলায় ফিল্ডিং করার সময় পা দিয়ে বল আটকাতে গিয়ে পেন্টের নিচে ইয়া বড় করে ছিড়ে গেল! আমার সাথে এরকম প্রথমবারের মত হল। খুব লজ্জা আর আনইজি ফিল হচ্ছিল। একতো বল আর টেপ কিনতে গিয়ে টাকা শেষ। বাসায় হেটে যাওয়া লাগবে এই অবস্থায়! তারউপর পেন্ট ছিড়ে গেসে। বাসায় আম্মু কি বলে সেই ভয়। কি করব ভাবছি। সেই সময় রেজাউল ওর গায়ের শার্টটা খুলে আমাকে দিয়ে বলল তোর কোমড়ে পেছাই নে। আর একটা রিকশা ঠিক করে টাকা দিয়ে দিল রিকশাওয়ালাকে। আমি ঘোরের মধ্যে রিকশাতে উঠে গেলাম কিছু না বলেই। রিকশা চলছে। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি ও বড় বড় ছিদ্র ওয়ালা ছেড়া সেন্টো গেঞ্জি গায়ে অন্যদের সাথে হেটে বাসায় ফিরছে। নিজেকে আবার অনেক ছোট মনে হল! আমার জন্য এভাবে বাসায় ফিরছে ছেলেটা। একবারও ভাবেনি এভাবে রাস্তায় হেটে বাসায় যাচ্ছে মানুষ কিংবা ওর মা কি বলবে! আরো খারাপ লাগলো এই ভেবে যে আমি ওর থেকে একটা দুরত্ব তৈরি করেছিলাম!
পরেরদিন শুক্রবার স্কুল বন্ধ। কত কি ভেবে রেখেছিলাম শনিবার গেলে ওকে কি বলব। কি বলে ধন্যবাদ দিব।প্রথমে নিজের হাতেই ওর শার্ট ধুয়ে নীল দিলাম। আম্মুকে বলেছিলাম শনিবার থেকে টিফিন নিব। এই কথা শুনে আম্মু অবাক! কখনই টিফিন নিতামনা আমি। ওর জন্যই আসলে নেয়া। একটা রুটিন করলাম ওকে কি কি সাব্জেক্ট পড়াবো। আব্বু খাতা কলম একবারে অনেকগুলা কিনে রাখত। সেখান থেকে দুইটা নতুন খাতা আর কলম নিলাম রেজাউলের জন্য। খুব এক্সসাইটেড হয়ে স্কুলে গেলাম সব গিফট নিয়ে। কিন্তু.. ও আসলোনা ক্লাসে। পরেরদিনও তাই। আসলো না। এরপরের দিনও না।
আর কখন আসেনি ক্লাসে ও।
কখনই আর বলা হয়নি দুরত্বের জন্য সরি। কিংবা বন্ধুত্বের জন্য ধন্যবাদ। গিফট গুলা দেয়া হয়নি। ওর তেমন কোন বন্ধু ছিলনা। একজন বলল ওরা গ্রামে চলে গেসে।
আর কোনদিন দেখাও হয়নি। ওর এতবড় উপকারের প্রতিদান দেয়া হয়নি। রাস্তায় হাটার সময় সবুজ চোখের কাউকে দেখলে আগ্রহ করে তাকিয়ে চেহারা দেখে বুঝার চেষ্টা করি রেজাউল কিনা। জানি চেহারা বদলে গেছে কিন্তু ওই চোখ জোড়া দেখে আমি ঠিকই চিনে নিব!
জানিনা কোথায় আছিস। আদৌ বেচে আছিস কিনা। কিন্তু তোর কথা মাঝে মাঝে খুব মনে পড়ে। ওই সবুজ চোখ আর ফেকাসে হাসি। ভাল থাকিস দোস্ত যেখানেই আছিস। তোর ওইদিনের উপকার আমি কখনই ভুলবনা।
No comments:
Post a Comment